আজ ,

সিলেটে বিদ্যুৎ ঘাটতির খেসারত দিচ্ছে জনগণ, অতিষ্ট জীবন

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত আগস্ট ১২, ২০২৬, ০৩:২৮ পূর্বাহ্ণ
সিলেটে বিদ্যুৎ ঘাটতির খেসারত দিচ্ছে জনগণ, অতিষ্ট জীবন

সিলেটে চাহিদার চেয়ে ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগে ফলে লোডশেডিংয়ের খেসারত দিতে হচ্ছে জনগণকে।

দিনের বেলা যেমন তেমন, রাতের বেলা বিশেষ করে মধ্যরাত কিংবা রাতের শেষভাগে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় ঘুম হারাম সিলেট নগরবাসীর।

মঙ্গলবার (বুধবার দিবাগত রাত) রাত ৩টা ২৫ মিনিটে এই রিপোর্ট লেখার সময়ে বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর আওতাধীন শিবগঞ্জ, সোনারপাড়াসহ আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না।

 সিলেট নগরী থেকে শুরু করে বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত দিন-রাতজুড়ে দফায় দফায় লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। কোথাও কয়েক মিনিট পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে, আবার কোনো কোনো এলাকায় একটানা এক-দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ের কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগও করেছেন বাসিন্দারা।

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। দিনের পাশাপাশি রাতেও দফায় দফায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে হাতপাখা কিংবা ব্যাটারিচালিত ফ্যান ব্যবহার করছেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়ির পানির পাম্প চালানো সম্ভব না হওয়ায় কোথাও কোথাও পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে।

শুধু বাসাবাড়ি নয়, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অনলাইনভিত্তিক কাজসহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রায় সব ক্ষেত্রেই। বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, দোকানপাট ও অফিসের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর, আইপিএস ও ব্যাটারি ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার সময় ভোল্টেজের ওঠানামায় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও করছেন ব্যবসায়ীরা।

বিদ্যুৎতের দাবিতে সড়ক অবরোধ:
লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে গত রোববার রাতে সিলেট সদর উপজেলার খাদিমপাড়া ও নগরীর টুকেরবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো কোনো এলাকায় প্রতি ঘণ্টার ব্যবধানে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সরবরাহ মিলছে না। তীব্র গরমের কারণে এতে মানুষের দুর্ভোগ আরও অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

শুধু সিলেট নগর নয়, বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার পরিস্থিতিও নাজুক বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। সিলেট জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কোথাও কোথাও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নগরীর পাঠানঠুলা এলাকার বাসিন্দা আজিজ খান সজিব বলেন, সারাদিন গরমের মধ্যে কাজ করে রাতে একটু স্বস্তিতে ঘুমানোর সুযোগ নেই। কখন বিদ্যুৎ চলে যায়, আবার কখন আসে তার কোনো ঠিক নেই। শিশুদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে।

নগরীর সুবিদ বাজারের বাসিন্দা সোমা বেগম বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে বাসাবাড়ির স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় বয়স্ক মানুষ ও শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধাক্কা:

লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়েছে বড় ধরনের প্রভাব। বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান, লাইট, এসি, কম্পিউটার, পানির পাম্পসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ও ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের ব্যবসায়ী পিকলু গোপ কালবেলাকে বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যান, লাইট, কম্পিউটারসহ আমার কয়েকটি দোকানের অনেক যন্ত্র চালানো যায় না। ক্রেতারাও গরমের কারণে বেশিক্ষণ দোকানে থাকতে চান না। ফলে ব্যবসায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

মৌলভীবাজারের দাসের বাজারের ব্যবসায়ী দিপাল দাস কালবেলাকে বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে শুধু ব্যবসা নয়, পুরো বাজারের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে দোকানে ক্রেতা কমে যায়। অনেক সময় লেনদেনও বন্ধ রাখতে হয়।

সিলেটের জৈন্তাপুরের বিকাশের দোকানের ব্যবসায়ী নাজমুল ইসলাম বলেন, আমাদের এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। অনলাইন লেনদেন, মোবাইল ব্যাংকিং ও কম্পিউটারের কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নগরীর লামাবাজারের ব্যবসায়ী নাসিম হোসাইন বলেন, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে শুধু বিক্রি কমছে না, বাড়ছে পরিচালন ব্যয়ও। জেনারেটর, আইপিএস ও ব্যাটারি ব্যবহার করতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার সময় ভোল্টেজের ওঠানামায় ফ্রিজ, কম্পিউটার, মোটর ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব আব্দুর রহমান রিপন বলেন, কয়েক দিন থেকে সিলেটে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। দিনে অনেকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় নগরবাসীর দুর্ভোগও চরমে পৌঁছেছে।

তিনি বলেন, অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেটে লোডশেডিংয়ের চাপ বেশি মনে হচ্ছে। অথচ মাস শেষে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলেও বিলের কোনো কমতি থাকে না। সিলেটের বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদারকি প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার পরিহার করে ব্যবসায়ী ও নগরবাসীকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

চাহিদা ২৫২, সরবরাহ ২০৭ মেগাওয়াট:

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেন, সিলেট বিভাগে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা ২৫২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ঘাটতি রয়েছে ৪৫ মেগাওয়াট। ফলে বর্তমানে ২০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেটে ঘাটতির পরিমাণ কম হলেও সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে কোথাও কোথাও দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এর পাশাপাশি কারিগরি ত্রুটি ও ট্রাবলশুটিংয়ের কারণেও মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম কারণ জ্বালানি ঘাটতি উল্লেখ করে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সংকট রয়েছে। কয়লাসহ প্রয়োজনীয় জ্বালানির সংকটের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমেছে।

তিনি বলেন, উদাহরণ হিসেবে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে সেখানে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

পরিস্থিতির উন্নতিতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কাজ চলছে জানিয়ে মোহাম্মদ ইমাম হোসেন বলেন, আশা করছি, দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। বর্তমান সংকটের সময়ে গ্রাহকদের ধৈর্য ধরার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে এসি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রায় চালানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এসি’র তাপমাত্রা প্রতি এক ডিগ্রি কমালে বিদ্যুৎ খরচ প্রায় ৩ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সবাইকে সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছি।

মূল রিপোর্ট: কালবেলা তবে নিউজ ইন্ট্রো সংযোজিত।