বিয়ের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় নববধূ রুকসানা বেগমের মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া বহুল আলোচিত মামলায় স্বামী আলী হোসেনকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে রায় ঘোষণার সময় আসামি পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।
সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে সুনামগঞ্জের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. হাবিবুর রহমান চৌধুরী দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে এ রায় ঘোষণা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আলী হোসেন ছাতক উপজেলার উত্তর খুরমা ইউনিয়নের বড়বিহাই গ্রামের সফর আলীর ছেলে।
মামলার এজাহার ও আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল ছাতক উপজেলার চরমহল্লা ইউনিয়নের নানকার গ্রামের মৃত আমিরুল ইসলামের ছোট মেয়ে রুকসানা বেগমের সঙ্গে ৩লক্ষ টাকার দেনমোহরে পারিবারিকভাবে আলী হোসেনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন অজুহাতে রুকসানার প্রবাসী ভাইদের কাছ থেকে যৌতুক আনার জন্য মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। চাহিদামতো ও বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে জিনিসপত্র দিতে না পারলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করিয়া কালো, ভাইট্রা (খাটো) বলিয়া অপমান, অবহেলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করিয়া আত্মহত্যার প্ররোচনা দিতো আলী হোসেন।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে যৌতুক না পেলে আলী হোসেন প্রায়ই রুকসানাকে উদ্দেশ্য করে বলতো, “ফাঁসি দিয়ে মরতে পারস না, তোর বাপের বাড়ি গিয়ে ফাঁসি দিয়ে মর।”
মামলার এজাহার অনুযায়ী, সংসার টিকিয়ে রাখতে রুকসানা তার মা ও ভাইদের কাছ থেকে স্বামীর দাবিকৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র এনে দিলেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। বরং দাম্পত্য জীবনে অবহেলা, মানসিক চাপ ও আত্মহত্যায় প্ররোচনামূলক আচরণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। গ্যাস সিলিন্ডার ও ফ্রিজের জন্য রুকসানাকে চাপ প্রয়োগ করে তাহার স্বামী। আত্মহত্যার আগে ২০২৫ সালের ২১জুলাই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বোনদের জানায়। বোনরা আশ্বাসদেন ভাইদের সাথে কথা বলে গ্যাস সিলিন্ডার ও ফ্রিজের ব্যবস্থা করে দ্রুত পাঠিয়ে দেবেন।
স্বামীর ধারাবাহিক নির্যাতন ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে স্বামীর আত্মহত্যার প্ররোচনায় ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই সকালে স্বামীর বাড়িতে বিদ্যুতের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন রুকসানা বেগম। আলী হোসেন বাড়িতে থাকলেও রুকসানাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেনি।
ছাতক থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
পরদিন নিহতের বড় বোন নাজমা বেগম বাদী হয়ে ছাতক থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে আলী হোসেনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন।
মামলার পর পুলিশ আলী হোসেনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পরে তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে আত্মগোপনে চলে যান।
মামলাটি তদন্ত করেন ছাতক থানার তৎকালীন ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) রঞ্জন কুমার ঘোষ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিনি আলী হোসেনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করে। সাক্ষ্য, আলামত ও অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন। এর ভিত্তিতে আদালত আলী হোসেনকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। একই সঙ্গে পলাতক আসামিকে গ্রেফতারের জন্য পরোয়ানা জারি করা হয়।
নিহতের বড় বোন ও মামলার বাদী নাজমা বেগম বলেন, “বোনকে হারানোর কষ্ট কোনো দিন শেষ হবে না। তবে আদালতের রায়ে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি বলে মনে করছি। এখন আমাদের একমাত্র দাবি, পলাতক আসামিকে দ্রুত গ্রেফতার করে আদালতের রায় কার্যকর করা হোক।”
বাদী পক্ষের আইনজীবী সিনিয়র এডভোকেট চান মিয়া বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মামলার নথিপত্রে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আদালত আইনের আলোকে যথাযথ রায় দিয়েছেন।
ছাতকে ব্যাপক আলোচিত এই মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলেও, পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেফতার করে সাজা কার্যকর হওয়ার পরই মামলার বিচারিক বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে।