চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। মামলায় দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে এখন পর্যন্ত ছয় মামলায় ৬১ জনকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা। তবে দণ্ডিত ৪১ আসামিই পলাতক।
বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ ও অভিযোগ গঠন পর্যায়ে রয়েছে আরও ২৩টি মামলা। এসব মামলায় শত শত আসামির বিচার চলছে।
একই সঙ্গে ৩৭টি অভিযোগ তদন্ত সংস্থার তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে পর্যাপ্ত প্রমাণ মিললে এসব অভিযোগেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
প্রসিকিউশন বলছে, ৫৯০টি অভিযোগ গ্রহণের পর যাচাই-বাছাই করে ১০৯টি তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে যেগুলোর তদন্ত শেষ হয়েছে সেগুলোর বিচার চলছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া জুলাই অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছিলেন। সেসময়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। পরে গত বছরের ৮ মে ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়।
শুধু জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনার বিচারই নয়, ট্রাইব্যুনালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুম-খুনের অপরাধেরও বিচার হচ্ছে।
তথ্য অনুসারে, এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলার রায়ে ৬১ জন বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত হয়েছেন। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১ তিন মামলার রায়ে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক পুলিশের আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ১৫ জনকে দণ্ড দিয়েছেন। এই তিন মামলায় পলাতক আসামি ১০ জন। অন্যদিকে তিন মামলার রায়ে ৪৬ জনকে সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। এর মধ্যে পলাতক রয়েছেন ৩২ আসামি। দুই ট্রাইব্যুনাল মিলিয়ে পলাতক আসামি ৪২ জন হলেও ডিএমপির সাবেক পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান একাই দুই মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন। পলাতকদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যে ছয়টি মামলার বিচার ইতোমধ্যে হয়েছে, আমি যোগদানের আগে তিনটি এবং আমি যোগদানের পরে তিনটি—এই ছয়টি বিচারকার্য শেষ হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে যে ছয়টা মামলার বিচারকার্য শেষ করতে আমরা পেরেছি, এইটা অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এবং পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার মধ্যে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে সম্পন্ন হয়েছে।’
‘আমি মনে করি যে এর চেয়েও যদি দ্রুত বিচারকার্য করেন তাহলে এই বিচার নিয়ে জনগণের প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, তাই এটি স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং স্বাভাবিক গতিতে এগুচ্ছে।’
বিচারের শেষ পর্যায়ে থাকা মামলাগুলোর বিষয়ে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আরও প্রায় আমাদের তিনটি মামলা এই মাসেই ইনশাআল্লাহ রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ।’
‘আজকেও একজন আসামি ওবায়দুল কাদের, তার মামলার যুক্তিতর্কের শুনানি চলছে। মাহবুব উল আলম হানিফের মামলায়ও যুক্তিতর্ক শেষ, রায় যেকোনো দিন হতে পারে।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘যাত্রাবাড়ীতে অত্যন্ত নৃশংসভাবে তাইম হত্যাকাণ্ডটা সংঘটিত হয়েছিল, সেটারও যুক্তিতর্কের শুনানি কয়েকদিনের মধ্যে শুরু হবে। আরও কয়েকটি মামলা কিন্তু বিচারকার্যের প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমরা মোটা দাগে যদি বলি যে জিয়াউল আহসান—তার মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণের প্রায় শেষ পর্যায়ে আমরা আছি, আর খুব বেশি সময় নেব না।’
তিনি আর বলেন, ‘এই জুলাই মামলাগুলো খুব দ্রুততার সঙ্গে আমরা ইনভেস্টিগেশন শেষ করে সম্ভাব্য আগামী এক বছরের মধ্যে যাতে অন্তত জুলাইয়ের সমস্ত বিচার আমরা শেষ করতে পারি, সেই বিষয়ে আমরা একটা কমিটমেন্ট নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। পাশাপাশি সারা দেশে ক্রসফায়ারের যে তিন হাজারের অধিক ঘটনা ঘটেছে, সে মামলাগুলোর অনেকগুলোর ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট হয়েছে।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘ইতোমধ্যে কক্সবাজারে কাউন্সিলর একরাম হত্যা মামলার এবং শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্যও শুরু হয়েছে। এছাড়া জুলাইয়ের বিচারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি গুম এবং ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ১২টি মামলার রিপোর্ট আমরা দিয়েছি এবং পর্যায়ক্রমে ফরমাল চার্জ দাখিল করছি; আরো কয়েকটা বাকি আছে যেগুলো কয়েকদিনের মধ্যে দিয়ে দেব।’
ছয় মামলায় যাদের সাজা হয়েছে
প্রথম রায়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে দেওয়া হয় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।
চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ মামলার আরও পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি ও দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, একজনকে যাবজ্জীবন ও একজনকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সাভারের আশুলিয়ায় গুলি করে হত্যা ও লাশ পোড়ানোর মামলায় ৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ মামলায় সাত আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও দুই আসামিকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে রাজসাক্ষী হওয়ায় আবজালুর রহমানকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সাবেক দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই মামলায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় রায়ে। এছাড়া কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।