ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল) দেশের অন্যতম আধুনিক ইউরিয়া সারকারখানা হলেও দীর্ঘদিন ধরে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের অভাব ও সময়মতো পূর্ণাঙ্গ ওভারহোলিং না হওয়ায় কারখানাটি পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে জাতীয় ইউরিয়া উৎপাদন, কৃষি খাত, স্থানীয় অর্থনীতি এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ে সম্ভাব্য প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
জানা যায়, ফেঞ্চুগঞ্জের সারশিল্পের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৬১ সালে ন্যাচারেল গ্যাস ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি (এনজিএফএফ)’র মাধ্যমে, যা এশিয়ার বৃহত্তম ইউরিয়া সারকারখানা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ২০১২ সালে কারখানাটি বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ২০১৫ সালের মার্চে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে একই স্থানে প্রতিষ্ঠিত শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করে এবং ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটির দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন এবং বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫ লাখ ৮০ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন। কিন্তু বাস্তবে গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। সর্বশেষ চলতি বছরও গ্যাস সংকটের কারণে কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারখানার একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বছরে গড়ে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাস পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যায়। ফলে ওই সময়টুকুতেই উৎপাদন চালানো সম্ভব হয় এবং বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের ভাষ্য, কারখানাটিতে সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ ওভারহোলিং করা হয়েছিল ২০১৯ সালে। বর্তমানে নতুন ওভারহোলিংয়ের প্রস্তুতি চলছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং নির্ধারিত ওভারহোলিং সম্পন্ন করা গেলে কারখানাটি আবার পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কারখানায় ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৫৩ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদিত হয়েছে, যা বার্ষিক স্থাপিত সক্ষমতার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
কারখানাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার সরকারি ক্রয় ও সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সরকারি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সার বস্তাবন্দি, লোডিং-আনলোডিং, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, প্রকৌশল সেবা, রাসায়নিক ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনবল সরবরাহসহ বিভিন্ন খাতে নিয়মিত উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়।
কারখানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আরো জানান, বর্তমানে অধিকাংশ সরকারি ক্রয়কাজ ই-জিপি (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। এতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে অনুমোদন সাপেক্ষে কিছু টেন্ডার স্থানীয়ভাবে সম্পন্ন করা হয়।
এদিকে কারখানাসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, অতীতে বিভিন্ন সময়ে টেন্ডার ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয়দের মতে, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনিক নজরদারি, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং সুশাসন আরও জোরদার করা প্রয়োজন। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। কারখানার জিএম (এডমিন) রেজাউল করিম এবং জিএম (অপারেশন) মো. সাজ্জাদুর রহমান তথ্য প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করেন।
ফেঞ্চুগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সারকারখানা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র রিয়াজ উদ্দীন ইসকা বলেন, এই সারকারখানা শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি ফেঞ্চুগঞ্জের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ, সময়মতো ওভারহোলিং এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কারখানাটি সারা বছর উৎপাদনে রাখা সম্ভব হবে। এতে রাষ্ট্র, কৃষক এবং স্থানীয় অর্থনীতি, সবাই উপকৃত হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা, ক্রীড়া সংগঠক ও কারখানার ঠিকাদার ইউসুফ আফসারুজ্জামান দেলোয়ার বলেন, কারখানার সঙ্গে হাজারো মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। এটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু থাকলে কর্মসংস্থান বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল থাকবে এবং জাতীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সচ্ছতার জন্য কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় ইউরিয়া উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য। এজন্য ফেঞ্চুগঞ্জের শাহজালাল সারকারখানাসহ রাষ্ট্রীয় সারকারখানাগুলোকে সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতায় পরিচালনা করা প্রয়োজন। এতে সার আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং কৃষকদের সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, ফেঞ্চুগঞ্জের এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), জ্বালানি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ওভারহোলিং সম্পন্ন করা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবল নিয়োগ, সুশাসন এবং টেন্ডার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা গেলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পাঞ্চল আবারও জাতীয় অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় আরও শক্তিশালী অবদান রাখতে সক্ষম হবে।