বিশিষ্ট সমাজসেবী, শিক্ষানুরাগী, কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব, আন্তর্জাতিক চ্যারিটি সংগঠন রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আরডিএফ) গ্লোবাল এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, আলহাজ্ব শামসুজ্জামান চৌধুরী ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
৪ জুন শনিবার, বিকাল ৪টা ৪৭ মিনিটে পূর্ব লন্ডনের কুইনস হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৫ বছর। তিনি ৪ ছেলে ও ৪ মেয়ে সহ অসংখ্য নাতি-নাতনি, আত্মীয়-স্বজন, গুণগ্রাহি রেখে গেছে।
মরহুমের গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার পাটলী ইউনিয়নের চানপুর গ্রামে। ষাটের দশকে তিনি যুক্তরাজ্যে আসেন।
মরহুমের স্মৃতিচারণ করেন করে লিখেছেন ইউকে জমিয়ত নেতা মুফতি আবদুল মুন্তাকিম। লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হল-
**আহ ! অবশেষে চলে গেলেন আমাদের প্রবীণ মুরব্বী ও অতুলনীয় অভিভাবক আলহাজ্ব শামসুজ্জামান চৌধুরী রাহঃ*
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ইউকের প্রবীণ মুরব্বী ও অন্যতম উপদেষ্টা, লন্ডন প্রবাসী আলহাজ্ব শামসুজ্জামান চৌধুরী (রাহঃ) অদ্য ৪ জুন ২০২২ শনিবার বিকেল চারটা ৪৭ মিনিটের সময় লন্ডনের কুইনস হসপিটালে এ ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া ত্যাগ করে আখেরাতের সফরে রওনা হয়ে গেলেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিয়ূন।
মরহুম আলহাজ্ব শামসুজ্জামান চৌধুরী বৃহত্তর সিলেটের জগন্নাথপুর উপজেলার পাটলি এলাকার চাঁনপূর গ্রামে পারিবারিক তথ্য মতে ১৯৩৭ ইংরেজি সনের জানুয়ারি মাসের ১৫ তারিখ জন্ম গ্রহণ করেন। এ হিসাব অনুযায়ী মৃত্যু কালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছরের কাছাকাছি। যৌবনের প্রারম্ভেই মরহুম আলহাজ্ব শামসুজ্জামান চৌধুরীর লন্ডন আসা হয়ে যায়। তিনি ইংল্যান্ডে জীবনের প্রায় ৭০ বছর সময়কাল অতিবাহিত করেন। তখনকার সময়ে ইংল্যান্ড তথা ব্রিটেনে বর্তমান দ্বীনি পরিবেশ চিন্তা করাও দুষ্কর ছিলো। দ্বীনি দৃষ্টিকোণ থেকে সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত একটি দুর্বিষহ প্রতিকূল পরিবেশ তখন ব্রিটেনের সর্বত্র বিরাজমান ছিল। এমন পরিস্থিতিতে দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত করে যাওয়া নিঃসন্দেহে অস্বাভাবিক কঠিন কাজ ছিল । এজন্য বেশিরভাগ মানুষদের কে তখনকার সময়ে দুনিয়া উপার্জন এবং স্বাবলম্বী হওয়ার চিন্তায় যে ব্যস্ত হতে হয়েছিল, এটাই রূঢ় বাস্তবতা। কিন্তু এমন কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলা বৃটেনের জমিনেও তাঁর কিছু সংখ্যক খাছ বান্দাদেরকে ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করে দ্বীনের মেহনত এবং ইসলামী কৃষ্টি কালচার রক্ষার খেদমতে নিয়োজিত হওয়ার তাওফীক দান করেছিলেন, এবং তাঁরা ত্যাগও কুরবানীর অসাধারণ নজীর স্থাপন করে সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে দ্বীন-ঈমান ও ইসলামী তাহজীব তমদ্দুন রক্ষায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন, বলতে দ্বিধা নেই বর্তমান দ্বীনি পরিবেশ তৈরিতে এসব বুযুর্গানেদ্বীনের ভূমিকাকে undermined করার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহর এসব মকবুল বান্দাদের মধ্যে মরহুম আলহাজ শামসুজ্জামান চৌধুরী রহমতুল্লাহি আলাইহির নাম ইতিহাসের পাতায় ইনশাআল্লাহ স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ব্রিটেনে আসার পর থেকেই তিনি বহুমুখী দ্বীনি, দাওয়াতী এবং সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মতৎপরতার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে পড়েন। দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত -যদি বলা যায়- যে তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যে পরিনত হয়েগিয়েছিল, তাহলে কোন অত্যুক্তি হবে না। অপর দিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও আকাবিরে জমিয়ত
উলামা- মাশায়েখ ও বুযুর্গানের সাথে তাঁর আত্মার সম্পর্ক এতো সুগভীর ছিলো যে আমাদের অনুসরণীয় পূর্বসূরিদের স্মৃতি বিজড়িত এ সংগঠন ও এর নীতি আদর্শ থেকে মুহূর্তের জন্যও বিচ্যুত হওয়া তাঁর পক্ষে চিন্তার বাইরে ছিলো। ব্রিটেনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে আলহাজ্ব শামসুজ্জামান চৌধুরীর নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। জমিয়তের আকাবির ও মাদানী সিলসিলার সকল বুযুর্গানের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা, অকৃত্রিম মুহাব্বাত ও অতুলনীয় ভক্তি শ্রদ্ধা ইতিহাসে উত্তম উদাহরণ হয়ে থাকবে সন্দেহ নেই। আজ থেকে দীর্ঘ পঞ্চাশ (50) বছর আগে যারা তাঁর কাছে পবিত্র কোরআন শরীফের তিলাওয়াতের শিক্ষা ও দ্বীনের আমলী তা’লীম পেয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ তাঁর ইন্তেকালের পর হাজির হয়ে শ্রদ্ধাভরে আজ তাঁর স্মৃতিচারণ করছেন! লন্ডন তথা ব্রিটেনে বহুসংখ্যক স্বনামধন্য মসজিদ- মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পেছনে মরহুম আলহাজ্ব শামসুজ্জামান চৌধুরী উলামায়ে কেরাম ও কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের সহযোগী বরং সহযোদ্ধা হয়ে দিবানিশি মেহনতের মাধ্যমে দ্বীনের অতন্দ্র প্রহরী এবং ইসলামের মহান ও নিবেদিত প্রাণ খাদিম হিসেবে যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, তা পশ্চিমা বিশ্বে অবস্থানরত মুসলমানদের জন্য আদর্শের এক মাইলফলক।
সর্বোপরি জনাব মরহুম আলহাজ্ব শামসুজ্জামান চৌধুরী রাহঃ তাঁর সার্বক্ষণিক এবাদত বন্দেগী, তাহাজ্জুদ গোযারী, দোয়া মোনাজাত, আদব আখলাক এবং অসাধারণ চারিত্রিক ও নৈতিক গুণাবলীর কারণে খাঁটি আল্লাহর ওয়ালী’র এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি ছিলেন।
সব সময় তাঁর জবান দিয়ে হৃদয়ের গভীরে থেকে “আল্লাহ” “আল্লাহ” শব্দের যিকির গুঞ্জরিত হতে থাকতো এবং দোয়ার কোন না কোন বাক্য উচ্চারিত হতো। সবার মুরুব্বী হওয়া সত্ত্বেও কারো খেদমত গ্রহণ করা ছিল তার রীতিবিরুদ্ধ। নিজ হাতে সকলের খেদমত করাকে তিনি অন্তর দিয়ে পছন্দ করতেন। মহিলাদের কে ঘরের কাজে সহযোগিতা প্রদান তাঁর উত্তম চরিত্রের একটি অনুসরণীয় দিক। দ্বীনি ও সামাজিক কাজের জন্য অবিরত দীর্ঘ সফর করতে- মনে হতো- তিনি কোন কষ্টই অনুভব করতেন না।
ইংল্যান্ডে আমাদের নবীন প্রজন্মের দ্বীনি ও ইসলামী ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি সঙ্গত কারণেই অনেক চিন্তামগ্ন থাকতেন। এর জন্য সবাই কে তিনি অসনি সংকেত ও দিয়ে যেতেন বরং এর জন্য সর্বত্র মসজিদ -মক্তব প্রতিষ্ঠার প্রতি উলামায়ে কেরাম ও দ্বীন দরদী সকলের মনোযোগ আকর্ষণ ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস। মরহুম আলহাজ্ব শামসুজ্জামান চৌধুরী রাহঃ তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলোতে দেশের গ্রামীণ এলাকায় গরীব অসহায় মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট লাঘবের মহান উদ্দেশ্যে এবং অসংখ্য মায়েদেরকে প্রসবকালীন আকস্মিক মৃত্যু থেকে বাঁচাতে মেটারনিটি হসপিটাল তৈরীর জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন।
এর জন্য তিনি রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন নামে নিয়মিত চ্যারেটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন এ মহান অর্গানাইজেশনের আমৃত্যু চেয়ারম্যান। তাঁর স্বপ্নের এ ব্যয়বহুল মেটারনিটি হসপিটালটি তাঁর দানকৃত মূল্যবান নিজস্ব ভূমিতে সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার পাটলি চাঁনপূর গ্রামে আলহামদুলিল্লাহ বেশ কয়েক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে নির্মিত হয়েছে। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় এর কার্যক্রম স্বচক্ষে দেখার সুযোগও পেয়েছেন।
উপায় উপকরণের অভাব এবং অস্বাভাবিক বেশি ব্যয়ভারের কারণে অজোপাড়াগাঁয়ে এধরনের একটি হসপিটাল নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবতার মুখ দেখতে পারবে বলে শুরুতে কোন আশা ছিল না, কিন্তু আলহাজ্ব শামসুজ্জামান চৌধুরী রাহঃ’র হৃদয়ের ব্যাকুলতা, আল্লাহ তায়ালার প্রতি তাঁর মজবুত আস্থা এবং দিবানিশি তাঁর দোয়া- মোনাজাত এ কঠিন কাজ কে সহজ করে দিয়েছে এবং আজ আল্লাহ তাআলার রহমতে জগন্নাথপুরের চাঁনপূর গ্রামে হসপিটাল টি অসংখ্য অসহায় মায়েদের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে এক অপূর্ব নেয়ামত হিসাবে দৃশ্যমান। মরহুমের কৃতি সন্তান জুনায়েদ আহমদ চৌধুরীর অবদান হসপিটালিটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চিরদিন অভুলনীয় হয়ে থাকবে।
মরহুমের জ্যেষ্ঠ সন্তান জুবায়ের আহমদ চৌধুরী, ফুজায়েল আহমদ চৌধুরী এবং তালহা চৌধুরীর প্রচেষ্টা কেও কোন ভাবে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অন্যান্য ফ্যামিলি মেম্বার, বন্ধুবান্ধব এবং রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এর ট্রাস্টিগনের অসামান্য কন্ট্রিবিউশন তো আছেই। কিন্তু এসব কিছুকে আমরা নির্দ্বিধায় আলহাজ্ব শামসুজ্জামান চৌধুরী রাহঃ এর মকবুল দোয়ার ফসল বলতে পারি। মৃত্যুকালে তাঁর রেখে যাওয়া চারজন ছেলে, চারজন মেয়ে, চারজন সন্তানতুল্য জামাতা এবং তাদের সকলের বহুসংখ্যক ছেলে মেয়ে মরহুমের জন্য ইনশাআল্লাহ অনেক বড় সাদাকায়ে জারিয়া।
এ মহান ব্যক্তিত্বের কর্মবহুল জীবনের বিস্তারিত বিবরণ এবং তাঁর চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলীর বিশদ আলোচনা একটি মাত্র প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ মুহূর্তে তাড়াহুড়োর মধ্যে কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাঁর উচ্চ মর্যাদা নিঃসন্দেহে এ সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধের বহু উর্ধ্বে।
তিনি আত্মীয়তার সম্পর্কে আমার তালই- ছোট বোনের শশুর ছিলেন। এজন্য আরো কাছে থেকে তাঁকে দেখার ও জানার সুযোগ আমার হয়েছে। আত্মীয়তার হক আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন। আমার আব্বাজান শায়খূল হাদীস হযরত মাওলানা আবদুল মুসাওয়ির ( আইয়রী হুজুর) ছাহেব দামাত বারাকাতুহুম এর সাথে “আপন বেয়াই” হওয়ার সুবাদে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতায় সিক্ত একটা গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েগিয়েছিল। দেশে যাওয়ার এক সুযোগে তিনি আমাদের গ্রামের বাড়ীতে সপ্তাহ খানেক অবস্থান করে যে আন্তরিকতা ও ভালোবাসার পরিচয় দিয়ে গেছেন, তা আমাদের জন্য অভুলনীয় । আল্লাহ তাআলা মরহুম আলহাজ শামসুজ্জামান চৌধুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি কে “খাইরুল জাযা” ও শায়ানে শান বদলা এনায়েত করুন। তাঁর কবর কে বেহেশতের বাগান বানিয়ে দিন। তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার পরিজনকে “সবরেজামীল” দ্বারা মালামাল করুন। আমীন সুম্মা আমীন।
বান্দায়ে নাচীজ
মুহাম্মদ আবদুল মুনতাকিম
লন্ডন
৫ জুন
ফজর টাইম