হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটা, চুরি ও বেচাকেনার অভিযোগে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ ৬২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে বন বিভাগ।
এর মধ্যে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে গাছ কাটা ও চুরিকৃত গাছ কেনাবেচার অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকালে চুনারুঘাট থানায় মামলাটি করেন সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন। বন আইন (২০০০ সালে সংশোধিত) এর ২৬(১ক)-এর (খ) ও (ঘ) ধারায় মামলাটি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৫ মে পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে চুনারুঘাট উপজেলার পাইকপাড়া ইউনিয়নের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ কাটা এবং এসব গাছ চুরি করে কেনাবেচা করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে গাছ কাটা, চুরি ও চুরিকৃত গাছ কেনাবেচার সঙ্গে ২০ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে দেওরগাছ ইউনিয়নের ময়নাবাদ গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন মিয়ার ছেলে ও চুনারুঘাট উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মারুফ মিয়াকে (৩০)।
এজাহারে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে গাছ কাটা ও চুরির সঙ্গে ১২ জন এবং চুরিকৃত গাছ কেনার সঙ্গে আরও আটজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। পরে বন বিভাগ তদন্ত শুরু করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়।
গাছ কাটা ও চুরির অভিযোগে মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন চুনারুঘাট উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মারুফ মিয়া, সাতছড়ি উদ্যানের সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির (সিএমসি) সভাপতি ও মাধবপুর উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শফিকুল ইসলাম আবুল, চুনারুঘাট পৌর শহরের উত্তর আমকান্দি গ্রামের গাছ ব্যবসায়ী মুনায়েম, দেওরগাছ গ্রামের কালা মিয়া, পাইকপাড়া ইউনিয়নের কাঠালবাড়ি গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস, মাঝিশাইল গ্রামের জসিম, গাজীপুর গ্রামের তাহির মিয়া, বদরগাজী গ্রামের আ. জলিল মিয়া এবং করমপুর গ্রামের রফিক মিয়া, হেলাল মিয়া ও মকবুল মিয়াসহ ১২ জন।
অন্যদিকে চুরিকৃত গাছ কেনার অভিযোগে আসামি করা হয়েছে উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মারুফ মিয়া, উপজেলা শ্রমিকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর খান, উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শফিক মিয়া মহলদার, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক করিম সরকার, গাছ ব্যবসায়ী বেলাল, মিরাশী ইউনিয়নের বড়ব্দা গ্রামের জমরুত, পাকুড়িয়া গ্রামের সোহেল এবং মিরাশী ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সোহাগসহ আটজনকে।
মামলায় নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মারুফ মিয়া বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গোপনীয় প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলাটি করা হয়েছে। অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে গাছ কেটে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ক্ষতি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
চুনারুঘাট থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে মামলাটি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, গাছ চুরির বিরুদ্ধে বন বিভাগ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার প্রায় এক মাস পর সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে গাছ চুরি ও কেনাবেচার অভিযোগে মামলা করা হলো।
এদিকে একই দিনে চুনারুঘাটের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে গাছ চুরি ও বিক্রির অভিযোগে আরও ৪২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বন বিভাগ। রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বন কর্মকর্তা এইচ এম এরশাদ বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল রেমা-কালেঙ্গায়ও দীর্ঘদিন ধরে গাছ কাটা, চুরি ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে। পৃথক দুটি মামলার ফলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধভাবে গাছ কাটা ও পাচারের বিরুদ্ধে বন বিভাগ ও পুলিশের অভিযান আরও জোরদার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
হবিগঞ্জের সীমান্তবর্তী চুনারুঘাট উপজেলার প্রায় ২৪০ হেক্টর বনাঞ্চল নিয়ে গঠিত সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। এ উদ্যানে সাতটি পাহাড়ি ছড়া রয়েছে। বন বিভাগের আওতায় এখানে সাতছড়ি ও তেলমাছড়া নামে দুটি বিট রয়েছে।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ বনাঞ্চল। এসব এলাকায় অবৈধভাবে গাছ কাটা অব্যাহত থাকলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।