আজ ,

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি: সন্তান হারিয়ে নির্বাক সাত পরিবার

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত আগস্ট ১৮, ২০২৬, ০২:৪০ অপরাহ্ণ
ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি: সন্তান হারিয়ে নির্বাক সাত পরিবার

লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে ভূমধ্যসাগরে ৯ বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধারের পর স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে মোট ২৯ বাংলাদেশি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৮ জন গুরুতর অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় মিসরের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

মিসরের কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাস ১৬ আগস্টের এক প্রাথমিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। এদের মধ্যে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৭যুবক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। এদের পাঁচজনের পরিচয় শনাক্ত করা
গেছে।

৩ আগস্টের পর থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি পরিবার। ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির খবরে শান্তিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে তাই স্বজনদের মাঝে আহাজারি শুরু হয়েছে।

তবে রোববার রাত থেকে সোমবার বিকেল পর্যন্ত সংবাদকর্মীরা নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ করলেও কেউই এব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দিতেও রাজি হননি। কথা হয় জেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রু মর্দন গ্রামের নিখোঁজ হৃদয় পালের বাবা রিন্টু পালের সাথে কথা হলে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, লিবিয়ায় বসবাসকারী ওমর আলী ও ডুংরিয়া গ্রামের দালাল কুদ্দুস আলীর মাধ্যমে ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে তার ছেলে হৃদয় ঢাকা থেকে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও আরব আমিরাত হয়ে চলতি বছরের ৯ জুন লিবি-য়ায় পৌঁছায়।

৩১ জুলাই সর্বশেষ কথা হয় ছেলের সাথে। তখন সে জানায় দালাল বলছে দু একদিনের মধ্যেই গেম দেবে। এর পর আর কোনো কথা হয়নি। তার খোঁজও পাচ্ছিনা।

একই উপজেলার চিকার কান্দি গ্রামের নিখোঁজ মামুন খানের চাচা বলেন, আমার ভাতিজা ৩ আগস্ট লিবিয়া থেকে নৌ-পথেগ্রীস যাওয়ার কথা জানায়। এরপর আর কোনো যোগাযোগ নেই। একই উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের এখলাছ উদ্দিনের ছেলে ছাব্বির আহমদ তালহার চাচাতো ভাই চিকার কান্দি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুর্শেদ আলম জানান, সর্বশেষ ৩ আগস্ট তালহার সাথে কথা হয়।

এরপর থেকে তার আর কোনো ফোন পাইনি। শান্তিগঞ্জ থানার ওসি ওলি উল্লাহ জানান তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জেনেছি কেউ কেউ মিশরে আছেন।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিল্লোল চাকমা জানান, উপজেলা প্রশাসনের লোকজন গিয়ে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেছেন। ৩ আগস্টের পর থেকে নিখোঁজদের সাথে তাদের পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ থাকার বিষয়টি তারা নিশ্চিত হয়েছেন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে এখন পর্যন্ত ৭ জনের নিখোঁজ থাকার তথ্য মিলেছে। তারা হলেন উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের চিকার কান্দি গ্রামের রাজা মিয়ার ছেলে রিপন মিয়া, ইসলাম উদ্দিনের ছেলে এনাম খান, হযরত খানের ছেলে মামুন খান, পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের এখলাছ উদ্দিনের ছেলে ছাব্বির হোসেন তালহা ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রু মর্দন গ্রামের রিন্টু পালের ছেলে হৃদয় পাল।

এছাড়া মিশরের হাসপাতালে পুলিশ প্রহরায় চিকিৎসাধীন আছেন আরও ৪ যুবক। তারা হলেন উপজেলার দরগাপাশা ইউনিয়নের সিচনী গ্রামের বদর উদ্দিন কামরান, একই ইউনিয়নের বুরমপুর গ্রামের আলীম উদ্দিন, পাথারিয়া ইউনিয়নের আবু সাঈদ ও আবদুল করিম।

জানা যায়, ৩ আগস্ট তাঁদের নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেওয়া রাবারের নৌকাটি ভূমধ্যসাগরে দিগভ্রান্ত হয়ে পড়ে। নৌকাটিতে ৩৮ বাংলাদেশি ও ৪ সুদানিসহ ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ছিলেন। সাগরে ভাসমান অবস্থায় তীব্র গরম, খাদ্য ও পানির অভাবে ১০ জন অসুস্থ হয়ে মারা যান। তাঁদের মধ্যে ৯ জন বাংলাদেশি ও একজন সুদানি। একপর্যায়ে মৃতদেহে পচন ধরলে সেগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হন জীবিত যাত্রীরা।
প্রায় ১১ দিন সাগরে ভাসমান থেকে গত ১৩ আগস্ট নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ এলাকার উপকূলে এসে পৌঁছায়। পরে স্থানীয় পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।

মিসরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের বাসিন্দা মুমূর্ষু আব্দুল করিম এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছার পর হঠাৎ নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। পরে টানা ১১ দিন নৌকায় ভাসতে থাকেন তাঁরা। একপর্যায়ে খাদ্যাভাব ও পানি-সংকটেচোখের সামনে ৯ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। দুর্গন্ধ ছড়ানোয় বাধ্য হয়ে সাগরে ভাসিয়ে দিতে হয় তাদের।

শান্তিগঞ্জ উপজেলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিল্লোল চাকমা বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর বিষয়টি জেনেছি। এর মধ্যে ৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো তাঁদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিখোঁজদের পরিচয় নিশ্চিতে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে।’