আজ ,

৬ মাসে প্রাণ গেল বিএনপির ৩৮ নেতাকর্মীর

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত জুলাই ৩১, ২০২৬, ১১:১৬ অপরাহ্ণ
৬ মাসে প্রাণ গেল বিএনপির ৩৮ নেতাকর্মীর

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই- এই ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় পৃথক ঘটনায় বিএনপির অন্তত ৩৮ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক সহিংসতা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সময়ে দেশে সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারাদেশে ১ হাজার ৯১টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত সময়ে বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নিহত ৩৮ নেতাকর্মীর মধ্যে বিএনপির ২১ জন, যুবদলের ৮ জন, ছাত্রদলের ২ জন, শ্রমিক দলের ২ জন, কৃষক দলের ২ জন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ জন এবং তাঁতী দলের ১ জন রয়েছেন।

‎বিএনপির নেতাকর্মী খুনের আলোচিত যত ঘটনা
২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর কাফরুল এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন যুবদলের কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ। ওই ঘটনায় আহত হয়েছেন যুবদলের আরেক কর্মী এবং এক সবজি বিক্রেতা। নিহত মো. ইউসুফ আলী কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুর অনুসারী ছিলেন। মূলত বাবুকে হত্যার জন্যই খুনিদের ভাড়া করা হয়েছিল।

ময়লার দরপত্র, ফুটপাতের দোকান, ব্যবসা, একটি টিনশেড বাড়ির দখলকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এর জেরে বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যা করতে ২৫ লাখ টাকায় ঝিনাইদহ ও মাগুরা থেকে শ্যুটার ভাড়া করা হয়। সেই গুলি মিস হয়ে পারভেজ নিহত হন। ‎এ ঘটনায় কাফরুল থানা পুলিশ ও ডিবি অভিযান চালিয়ে শ্যুটার চঞ্চল মোল্লা, জিহাদ মোল্লা, জিয়ারুল মোল্লা, মাসুম বিল্লাহ, নাহিদ হাসান, আবির হাওলাদার, আলী হোসেন ও শাফিন আহমেদকে গ্রেফতার করেছে।

এর আগে, ২১ জুলাই রাতে রাজধানীর সবুজবাগে ইব্রাহিম পলাশ নামে ওয়ার্ড বিএনপির এক কর্মীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। সে সময় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার দুই হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। নিহত পলাশ লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর এলাকার আবুল বাশারের ছেলে। তিনি সবুজবাগের ৭১ নম্বর মাদারটেক এলাকায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন।

‎স্থানীয়রা জানান,পূর্বশত্রুতার জেরে একই এলাকার যুবদল নেতা রয়েল, সবুজ, নাঈমসহ ১০ থেকে ১২-১৫ জন মিলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করে। এতে তার দুই হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বুকেও দুটি আঘাত করে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

গত ১৫ জুলাই কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলায় পদ স্থগিত হওয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে (৫২) দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে। পরে জানা যায়, স্থানীয় ছাত্রদলের এক নেতার সঙ্গে বিরোধে এই হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কাশিমপুর কারাগার থেকে তিন অপরাধীকে জামিনে মুক্ত করে ভাড়ায় এই হত্যাকাণ্ডের জন্য নিয়োজিত করা হয়।

‎এর আগে, ৮ জুন রাতে রাজধানীর মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় যুবদলের ২১ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, ফুটপাতের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ জেরে এই হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের শম্ভূপুরা ইউনিয়নের চরহোগলার বালুরঘাট এলাকায় বিএনপির কর্মী রাজু আহম্মেদকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। স্বজনদের দাবি, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের রাউজানে ১৩ জুন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে, ১২ জুন খুলনার লবণচরার মাথাভাঙ্গায় বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলামকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২ জুন ময়মনসিংহে খুন হন বিএনপির কর্মী রানা মিয়া। ৯ জুন বাগেরহাটের ফকিরহাটে বারুইপাড়া ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়লকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ড নিয়ে মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন
‎মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) নির্বাচনপরবর্তী সময়ে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা নিয়ে ১২ এপ্রিল এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তী সময়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করলেও নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের বহু ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‎তিন মাসে কমপক্ষে ৬১০টি ‘রাজনৈতিক সহিংসতার’ ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩৬ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪০৭৮ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, বিভিন্ন দলের সমাবেশকেন্দ্রিক সহিংসতা, প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশব্যাপী ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

‎জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এ তিন মাসে সহিংসতার ৬১০টি ঘটনা ঘটে। ৬১০টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৯৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৫৮৫ জন এবং নিহত ২৪ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ২৬০টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬৫৪ জন এবং নিহত ৭ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ৩৬টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২১৯ জন এবং নিহত হয়েছেন ৩জন। বিএনপি-এনসিপি মধ্যে ২৩টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২০৪ জন, আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে ৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত ৫১ জন, বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে ৬০টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬৯ জন।

এছাড়া, বিভিন্ন দলের মধ্যে ৩৪টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৯৬ জন এবং নিহত হয়েছেন ২ জন। ৬১০টি সহিংসতার ঘটনার ৫৭৩টিই (৯৪%) ঘটেছে ক্ষমতাসীন বিএনপির অন্তর্কোন্দল এবং বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘাতে। নিহত ৩৬ জনের মধ্যে বিএনপির ২৮ (৭৮%) জন, জামায়াতের ৪ (১১%) জন, আওয়ামী লীগের ১ জন এবং অন্যান্য ৩ জন।

উল্লিখিত তিন মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তত ৩৯৫টি সহিংসতার ঘটনায় কমপক্ষে ২,৫৭৩ জন আহত হয়েছেন এবং নিহত হয়েছেন ১২ জন। এছাড়া নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ৬০০টিরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

চলতি বছরের ২ জুলাই প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে সহিংসতার অন্তত ৫৮টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ২১টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৪৬ জন। এর মধ্যে বিএনপির ৩ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।

‎‎বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী গণমাধ্যমকে বলেন, বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সন্ত্রাসীরা ওঁৎ পেতে বসে আছে। এদেরই হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে সরকার ও প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। পুলিশ প্রশাসন আরও বেশি কর্মতৎপর হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

‎কী বলছে পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা
‎ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা এক একটি ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আসামিকে শনাক্ত করে তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করি। মাঠপর্যায়ে এসব ঘটনার নেপথ্যে কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে পুলিশ।

এই কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয় ময়লার দরপত্র, ফুটপাতের দোকান, ব্যবসা এবং বাড়ির দখলকে কেন্দ্র করে এমন ঘটনা ঘটে। অবশ্যই এসব ঘটনায় স্থানীয় সন্ত্রাসীরা বাহির থেকে শ্যুটার ভাড়া করে এনে এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে।

বেআইনি আর্থিক খাতের কারণে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বাড়ছে বলে মনে করেন ‎ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিজ্ঞানী তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, দেশে বেআইনি কিছু আর্থিক খাত ফুটপাত, ময়লা-বাণিজ্য, পরিবহন ও দখল বাণিজ্যের খাত রয়েছে। এসব দখল বা নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে নিয়মিত সহিংসতা কিংবা হত্যার ঘটনা ঘটছে। আমাদের দেশে রাজনৈতিকভাবে এসব আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে না পারলে এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকবে।

এই অপরাধ বিজ্ঞানী বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে সহনশীলতা বৃদ্ধি, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের ঘটনা জনমনে উদ্বেগ আরও বাড়াবে।

তথ্যসূত্র: ঢাকামেইল