আজ ,

সিলেটে কী কারণে বাড়ছে হত্যাকান্ড? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত আগস্ট ২৬, ২০২৬, ১১:০৫ অপরাহ্ণ
সিলেটে কী কারণে বাড়ছে হত্যাকান্ড? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ধর্ষণের অভিযোগে আইনের আশ্রয় নিতে গিয়ে পুলিশের সামনেই প্রাণ দিতে হয়েছে বাবাকে। নিজের বিলাসবহুল বাসাতেই খুন হয়েছেন স্বামী-স্ত্রীসহ তিনজন।

ফুটবল খেলার সামান্য বিরোধ রূপ নিয়েছে কিশোর হত্যায়! বাবার কাছে সন্তান যেন নিরাপদ নয়, দুই সন্তানের হত্যাকারী হিসেবে সামনে এসেছেন খোদ বাবা। অনেকেই গুপ্ত হত্যারও শিকার হয়েছেন।

সাম্প্রতিক এমন লোমহর্ষক অপরাধ আতঙ্ক ছড়িয়েছে সিলেটে। নগরী ও প্রত্যন্ত জনপদে একের পর এক হৃদয়স্পর্শী অপরাধ মানুষকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।

অপরাধের কারণ ও ধরণ ভিন্ন হলেও একসঙ্গে পাশাপাশি রাখলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সামাজিক অবক্ষয় এবং পারিবারিক বন্ধনের চিড় ধরার বিষয়টি।

এসব অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও। এ ধরনের লোমহর্ষক অপরাধের ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিচার চাইতে গিয়ে প্রাণ গেল বাবার:

সাম্প্রতিক সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে গোয়াইনঘাট উপজেলার দিঘীরপাড় গ্রামে। ১৫ আগস্ট দুপুরে হত্যার শিকার হন কলিম উল্লাহ (৫০)।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কলিম উল্লাহর মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে তাঁর ভাইয়ের ছেলে জুবের আহমদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়ভাবে সালিসে প্রতিকার না পেয়ে কলিম উল্লাহ মেয়েকে নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পুলিশ অভিযুক্তকে খুঁজতে বের হলে তাদের সঙ্গে যান কলিম উল্লাহও। সেখানেই হামলার শিকার হয়ে তিনি প্রাণ হারান। এ ঘটনায় ধর্ষণের অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তবে, হত্যায় জড়িত এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এই হত্যাকান্ড কেবল একটি অপরাধের ঘটনা নম্র এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও গভীর একটি প্রশ্ন। একজন বাবা যখন সন্তানের ওপর নির্যাতনের বিচার চাইতে আইনের দ্বারস্থ হন, তখন সেই অভিযোগের কারণেই যদি তাঁকে জীবন দিতে হয়, তাহলে ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা কোথায়? আইনের আশ্রয় নেওয়ার বদলে পারিবারিক-সামাজিক চাপে অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা থাকলে ভুক্তভোগীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে গোয়াইনঘাটের ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

নিজের ঘরেই অনিরাপদ, তিনজনের রক্তে রঞ্জিত রায়নগর:

এই ঘটনার তিন দিন আগে, ১২ আগস্ট, সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় নিজ বাসায় খুন হন প্রবীণ ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা। একসঙ্গে তিনজনের এই হত্যাকান্ড পুরো সিলেটকে নাড়িয়ে দেয়।

পরিবারের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান বলে বিবেচিত ঘরের ভেতরেই যখন এমন নৃশংসতা ঘটে, তখন তা নগরজীবনের নিরাপত্তাবোধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনার তদন্তে বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে। এ ঘটনায় বাবুল মিয়া (৪০) নামে একজনকে গ্রেফতার দেখিয়ে রিমা-ে নেয় পুলিশ। আদালতে বাবুল মিয়া লোমহর্ষক হত্যায় দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কিন্তু তার পরস্পর বিরোধী বক্তব্য জনমনে জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্বেক করেছে। হত্যাকা-ে তাঁর সংশ্লিষ্টতা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়েও উটেছে প্রশ্ন।

নিহতের পরিবার দায়ের করা মামলায় তাঁকে আসামি করেনি, বরং হত্যাকা-ের নেপথ্যে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেছে তারা।

ফুটবল মাঠের বিরোধ গড়াল কিশোর হত্যায়:

২৭ জুলাই সন্ধ্যায় নগরীর কাজিরবাজার সেতু এলাকায় ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে প্রাণ হারায় ১৫ বছর বয়সী রিফাত আহমদ। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মাঠে বিরোধের সূত্রপাত হলেও পরে সেতুর ওপর ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত রিফাতকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কিশোরদের কাছে খেলাধুলা যেখানে বন্ধুত্ব আর আনন্দের জায়গা হওয়ার কথা, সেখানে সামান্য বিরোধ প্রাণঘাতী সংঘাতে রূপ নেওয়া কিশোরদের সহনশীলতা ও সংঘাত নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দাবিতে খোদ তার মা মানববন্ধনেও অংশ নিয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য মতে, আসামিদের সবাই পলাতক। সেই পলাতক আসামিদের একজনকেও ধরে পুলিশে দিয়েছে র্যাব-৯।

জন্মদাতা পিতার হাতেই জীবন শেষ দুই শিশুর:

কাজিরবাজার সেতুর ঘটনার একই দিনে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাইয়ে নিজের দুই শিশুসন্তানকে হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হযন কামরুল ইসলামকে। দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, কামরুল তাঁর দুই সন্তান মোহাদ্দিস মিয়া (৮) ও তুলনা আক্তারকে (৪) পানিতে ফেলে হত্যা করেন। পরে শান্তিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার পৃথক দুটি হাওর থেকে শিশু দুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। দুই সন্তানকে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন কামরুল ইসলাম।

জন্মদাতা বাবার হাতেই যখন সন্তান নিরাপদ নয়, তখন প্রশ্ন ওঠে পরিবারের ভেতরেই কোথায় ঘটছে এই ভাঙন? এসব ঘটনা জনজীবনে ছড়িয়ে দিয়েছে চাপা আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা।

সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক ও উপাধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. আহমদ রিয়াদ চৌধুরীর মতে, সামাজিক অস্থিরতার সূত্রপাত ঘটতে পারে পরিবার থেকেই। চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান, অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক বন্ধনে বিশ্বাসের ঘাটতি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, তরুণদের একাংশের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা এবং তা পূরণে ব্যর্থতা থেকে জন্ম নেওয়া হতাশা মানসিক সংকটকে আরও প্রকট করেছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর তানজিনা চৌধুরী বলেন, মানুষের আর্থিক সংকট বাড়ছে। কর্ম সংস্থান হচ্ছেনা, সবাই রাতারাতি কিছু পাওয়ার আশায় মরিয়া হয়ে রয়েছে। সমাজ থেকে ক্রমেই নীতি নৈতিকতার বোধ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। সাধারণ মানুষ যখন দেখছে দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে অনেকে অন্যায় করছেন, বা যারা স্পষ্টতই অন্যায় করছেন, দুর্নীতি করছেন, আইন অমান্য করছেন তারপরেও কোন শাস্তি পাচ্ছেন না বরং খুবই সুন্দর অতি স্বচ্ছল জীবন যাপন করছেন এই বিষয় গুলো অনেক সময় তাঁদের মধ্যে এই বোধ তৈরী করে যে আমিও তো পারি যেকোনো উপায়ে তাঁদের মতো বিলাসি জীবন যাপন করতে। এই আশায় মানুষ বড় অন্যায় করতেও পিছপা হয়না।

আমাদের মধ্যে এখন পারস্পরিক যোগাযোগ এর খুব অভাব। সহণশীলতা, সহানুভূতির অভাব আমাদেরকে একটা ভয়ানক সামাজিক অবস্থার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।

সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ জোবায়ের বখ্ত জুবের বলেন, সামাজিক অস্থিরতার পেছনে মূল কারণ হচ্ছে শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা। উচ্চাভিলাষী আর প্রবাসের স্বপ্ন মননে ধারণ। ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে থাকা, সর্বোপরি ফ্যামেলি গাইডলাইনের যথেষ্ট অভাব। অভিভাবকদের খেয়ালিপনা।

অ্যাডভোকেট মোঃ জোবায়ের বখ্ত জুবের আরও বলেন, সিলেটের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সুরক্ষায় লিডারশীপের অভাব রয়েছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সদিচ্ছা, সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা দূর হবে বলে আমি আশাবাদী।

আম্বরখানা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব মুফতী জিয়াউর রহমান বলেন, সামাজিক অস্থিরতা, নৈতিক অবক্ষয়, খুন-খারাবির মূলে রয়েছে কয়েকটি কারণ।

প্রথমত মানুষ ব্যাপকভাবে হারাম খাচ্ছে। বান্দার হক সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষ উদাসীন। সুদ, ঘুষ, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত মাদকের ছোবল আজ মহামারি আকার ধারণ করেছে৷ নানা নামে আজ মানুষ নেশা করছে। সীমান্ত হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে প্রচুর মাদকের আমদানি হচ্ছে। নেশার কারণে মানুষের ভেতর আর মনুষ্যত্ব থাকে না। যার কারণে ঠুনকো অজুহাত মানুষ খুন করতে ভাবে না।

তৃতীয়ত জুয়া আজ ঘরে ঘরে। অনলাইন জুয়া এখন মানুষের মোবাইলে মোবাইলে। অনলাইন বেটিং, ক্যাসিনোর ঘরে জুয়া. ঢুকেছে। মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে।

মোটাদাগে এই তিনটি কারণে সামাজিক অস্থিরতা, অপরাধপ্রবণতা ও খুনখারাবি বেড়েছে। ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই তিনটি বিষয়ই ভয়াবহ গোনাহ। শরীয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

এসবের ব্যাপারে ব্যাপক দাওয়াতি কার্যক্রমের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে কঠোরভাবে এগুলো বন্ধ না করলে এসব বন্ধ হবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো হবে না।

তথ্যসূত্র: দৈনিক শ্যামল সিলেট