ওসমানি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগী অতিরিক্ত চাপ। যে কারনে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল রোগীদের দ্বিতীয় ভরসাস্থল। করোনাকালীন বিশেষায়িত এই হাসপাতালটির সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গাইনি, ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ নানাবিধ রোগের চিকিৎসা প্রদান করে আসছে হাসপাতালটি।
সম্প্রতি আগুনকা-ে হাসপাতালটি মৃত্যুকূপে পরিণত হতে পারতো। ওইদিন বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে এই হাসপাতাল। গত ১৬ নভেম্বর শনিব-ার মধ্যরাতে দুর্বৃত্তরা হাসপাতাল অভ্যন্তরে একটি এম্বুলেন্সে পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করে। তাতে পার্কিয়ে রাখা এম্বুলেন্স আগুনে ভস্মিভূত হয়।
হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্সে আগুনকান্ডে সিলেটের সচেতন মহল ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। কিন্তু ঘটনার ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো অধরা রয়েছে জড়িতরা। এখনো পর্যন্ত তাদের কাউকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়নি পুলিশ।
জড়িতদের গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে চাইলে-এসএমপি মিডিয়া অফিসার (ডিসি উত্তর) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনার সাথে জড়িতদেরকে সনাক্ত করা হয়েছে। তাদের কে ধরতে প্রযুক্তির সহায়তায় আমরা অভিযান অব্যাহত রেখেছি।
হাসপাতালের সিসি ক্যামেরা ঘেটে দেখা যায়, দুটি মোটর সাইকেলযোগে কতিপয় দুর্বৃত্তরা হাসপাতালের অভ্যন্তরে ঢুকে।
বড় দুর্ঘটনার শঙ্কায় কর্তৃপক্ষ, অধরা আগুন সন্ত্রাসীরা হাসপাতালেরর প্রধান ফটকটি তখন খোলা এবং কোনো নৈশ্য প্রহরী ছিল না। ফলে সহজেই হাসপাতালের ভেতর ঢুকে পড়ে পার্কিয়ে থাকা এম্বুলেন্সে আগুন ধরানোর সুযোগ পায় দুর্বৃত্তরা।
এই ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কেননা এখন পর্যন্ত কোন চিকিৎসা কেন্দ্রে দুর্বৃত্ত কর্তৃক হামলা বা অগ্নি সংযোগের ঘটনা সিলেটে বিরল। এ কারণে রোগী ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারন শামসু-দ্দিন হাসপাতালের অগ্নিকা-ের ঘটনায় ওইদিন ঘটতে পারতো আরো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি। জীবন বিপন্ন হতে পারতো চিকিৎসাধীন থাকা রোগি ও চিকিৎসক-নার্সদের। হাসপাতালে চিকিৎসারত ছিলেন ৫৩ জন রোগী। ছিলেন ডাক্তার, নার্স, সাপোর্ট স্টাফসহ আরো অনেকেই।
কেননা, দুর্বল নিরাপত্তার সুযোগে হাসপাতালের অভ্যন্তরে রয়েছে ১০হাজার লিটার অক্সিজেন উৎপন্ন বিশিষ্ট্য অক্সিজেন প্লান্ট টার্গেট করতে পারতো দুর্বৃত্তরা। এই অক্সিজেন প্লান্টে আগুনে দিলে ঘটতে পারতো বড় ধরনের দুর্ঘটনা। জীবন বিপন্ন হতে পারতো অনেকের। হতবাক করার মতো বিষয় হলো-এইহাসপাতালের কোন নিরাপত্তা কর্মী নেই। রাতের বেলায় প্রধান ফটকের জন্যও নেই কোন নৈশপ্রহরী। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মোট ১৯২ জন জনবল হাসপাতালটিতে। এরমধ্যে ৩০ জন ডাক্তার, নার্সসহ ৯২ জন এবং বাদবাকি ৭০জন সাপোর্ট স্টাফ। তন্মধ্যে ৪ জন নৈশ প্রহরী থাকলেও রাতের বেলা থাকেন হাসপাতাল অভ্যন্তরে। তাদের দিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ড সমুহের দায়িত্ব পালন করানো হয়। হাসপাতালের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে ৪৩টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। ১০ হাজার লিটার অক্সিজেন প্লান্ট রয়েছে হাসপাতালের অভ্যন্তরে। হাসপাতাল অভ্যন্তরে থাকা চার নৈশপ্রহরী কখনো বাহিরে আসেন না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্ জার্নালিস্ট কমিশনের সভাপতি ফয়সল আহমদ বাবলু বলেন, হাসপাতালের ভেতরে অগ্নিসংযোগের ঘটনাটি সত্যিই খুবই উদ্বেগজনক। এর আগে সিলেটে এমন ঘটনা আমাদের নজরে পড়েনি। এই ঘটনায় রোগী ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদেরকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। আমি প্রশাসনের প্রতি আহবান জানাই, তারা যেন দ্রুত সেই সব অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসেন। পাশাপাশি এদের পেছনে ইন্ধনদাতাদেরকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা।
শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মিজানুর রহমান বলেন, গাড়িতে আগুন লাগার ঘটনাটি আমাদেরকে শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে কোনদিন কাউকে হাসপাতালে আক্রমন বা দূর্ঘটনা ঘটাতে দেখিনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহবান জানাচ্ছি, তারা যেন এই ঘটনার সাথে জড়িতদেত দ্রুত গ্রেফতার করে। আমাদের সবচেয়ে বেশি জরুরি নিরাপত্তার জন্য কিছু আনসার সদস্য সংযুক্ত করা। আমরা মন্ত্রনালয়ে গত তিন বছর ধরে একাধিক পত্র প্রেরণ করেছি আনসার সদস্য প্রেরণে। হাসপাতাল অভ্যন্তরে দুর্বৃত্তায়নের ঘটনায় এখন নিরাপত্তাহীন বোধ করছি। কারন এখানে অক্সিজেন পাওয়ার প্লান্ট, আইসিইউসহ ইমার্জেন্সী বহুরকমের স্পর্শকাতর যন্ত্রপাতি রয়েছে। শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের এম্বুলেন্সের চালক মো. আবদুল কাদির লিটন বলেন, ১৬ নভেম্বর ৫ জনসহ অজ্ঞাতনামা কোতোয়ালী থানায় এই ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করেছি। গত বৃহস্পতিবার সকালে গাড়িটি ট্রায়াল দিয়ে বন্ধ রাখি। তারপর আর গাড়িটি ব্যবহার হয়নি। ঘটনার দিন রাতে ‘আরএমও স্যার’ ফোন দিয়ে আমাকে গাড়িতে আগুন লাগার বিষয়টি জানান।
মূল রিপোর্ট: দৈনিক শ্যামল সিলেট