আজ ,

সিলেট মহানগর বিএনপি’র সভাপতি পদ নিয়ে নাসিম-লোদীর টানাটানি

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত ডিসেম্বর ৩, ২০২৫, ০২:২৫ অপরাহ্ণ
সিলেট মহানগর বিএনপি’র সভাপতি পদ নিয়ে নাসিম-লোদীর টানাটানি

সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নিয়ে টানাপোড়েন থামছে না। নাসিম হোসাইন দাবি করেছেন, তিনি সিলেট মহানগর বিএনপির ‘নির্বাচিত বৈধ সভাপতি’। অন্যদিকে, কয়েস লোদী দাবি করেছেন, তিনিও ‘বৈধ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি’। কেননা, দল তাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করেছে কমিটি ঘোষণা করে। এজন্য কেন্দ্র থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছিল। সভাপতির পদ থেকে আমাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে এখনও কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি কেন্দ্র থেকে পাঠানো হয়নি। তাই এখনও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আছি।

দলের শীর্ষ দুই নেতা পরষ্পর মুখোমুখী হওয়ায় তৃণমূলে বাড়ছে ক্ষোভ। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে তাদের এই কোন্দল সিলেট বিএনপির রাজনীতিতে অনেকটা প্রভাব পড়বে। তাদের এমন কর্মকান্ডে সিলেট বিএনপিতে সমন্বয়হীনতা নেই বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তারা দ্রুত এ বিষয়টির সমাধান দাবি করেছেন।

নগর বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা নাম প্রকাশ না করে সিলেটের মানচিত্রকে বলেন, এখন যে অবস্থা তাতে মনে হয়েছে আমরা কোন ইউনিয়নে আছি। অথচ বিভাগীয় নগরীর একটি কমিটি নিয়ে যে অবস্থা তাতে আমাদেরকে অনেক নীচে নামিয়ে এনেছে। এজন্য তিনি কেন্দ্রকে দায়ি করে বলেন, কেন্দ্রের উচিৎ পরিপূর্ণ ব্যাখা দিয়ে এ বিষয়টির সমাধান করা। কেন্দ্র থেকে যে চিঠি দিয়ে নাসিম হোসাইনকে জানানো হয়েছে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য, একইভাবে ভারপ্রাপ্তকেও চিঠি দিয়ে জানানো উচিৎ ছিল তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার। আর এটি না হওয়ায় তাদের মধ্যে নতুন করে বিরোধ তৈরী হয়েছে। এই বিরোধ আগামী নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে বলেও তিনি মনে করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়ার্ড বিএনপির এক নেতা বলেন, গত ক’দিন ধরে যা চলছে তা খুবই দুঃখজনক। এখন আমাদের সমস্যা হলে কার কাছে ফরিয়াদ জানাব। তিনি আরও বলেন, সোমবার কাজীটুলা মাদ্রাসায় যা হয়েছে সেটি গণমাধ্যমে এসেছে। মাদ্রাসায় গিয়ে দাপট দেখানোর মত ঘটনাও ঘটেছে। অনেকেই বিষয়গুলো পরিষ্কারও করেননি। ওই ঘটনায় যতদূর শুনলাম তাতে মনে হয়েছে এটির সমাধান জরুরী। নতুবা বড় ধরনের ঘটনাও ঘটতে পারে।

গত ২৬ নভেম্বর রাতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নাসিম হোসাইনের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের কথা উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, তার প্রাথমিক সদস্যসহ সকল পর্যায়ের পদের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

অবশ্য, পরদিন ২৭ নভেম্বর রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে নতুন আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ভুলবশত’ আগের দিন নাসিম হোসাইনের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, তার কোনো দলীয় পদ স্থগিত ছিল না।’ অর্থাৎ বিজ্ঞপ্তির ভাষ্য অনুযায়ী, নাসিম হোসাইন নির্বাচিত সভাপতির পদেই বহাল আছেন।

নাম প্রকাশ না করে নগর বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান, কেন্দ্র যে চিঠি দিয়েছে তাতে গঠনতন্ত্র ও সংগঠনের কাঠামো অনুযায়ী কয়েস লোদী আর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পদে থাকতে পারেন না। দলের নিয়মানুযায়ী, কয়েস লোদীকে আর সভাপতি মানছেন না অনেকেই।

নাসিম হোসাইন ও কয়েস লোদীকে নিয়ে গেলো ক’দিন ধরে মহানগর বিএনপিতে যে জল ঘোলা হলো তার দ্রুত সমাধান না হলে বড়ধরনের অনাকঙ্খিত ঘটনা ঘটতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কারণে দলীয় নির্দেশ পেতে নাসিম হোসাইনকে একটু অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানায়।

স্থানীয় বিএনপি সূত্র জানায়, বিগত ১৭ বছর সিলেটের রাজপথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন নাসিম হোসাইন। জুলাই আন্দোলনে উত্তাল সিলেটে সাংবাদিক তুরাব নিহত হওয়ার দিনেও ঘটনাস্থলে বিক্ষোভে ছিলেন নাসিম। ওই সময়ে তিনি সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে আন্দোলনে নেতাকর্মীদের সহায়তা ও নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দায়ের করা সিলেট কোতোয়ালি থানার বহু মামলার আসামি ছিলেন নাসিম।

জুলাই আন্দোলন শেষে চিকিৎসা নিতে বিদেশে চলে যান নাসিম হোসাইন। এসময় মিফতাহ সিদ্দিকীকে মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে মিফতা সিদ্দিকীকে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদে সরিয়ে নেয়া হয়। তখন নাসিম হোসাইনের সুপারিশেই কয়েস লোদীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। কয়েস লোদীর কমিটিতে নাসিম হোসাইনের নির্বাচিত সভাপতির পদ রেখেই কমিটি ঘোষণা করেছিল বিএনপি। কেননা, নাসিম হোসাইনকে দল বহিষ্কার করেনি, তার পদও স্থগিত করেনি। তিনি চিকিৎসার কারণে বিদেশে থাকায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়েছিল কয়েস লোদীকে। চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরলেও কেন্দ্রীয় বিএনপির পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলেন নাসিম।

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, সিলেট সিটি করপোরেশনের আগামী নির্বাচনে কয়েস লোদী বিএনপির প্রার্থী হতে চাইছেন। কিন্তু সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বিএনপির এমপি মনোনীত না হওয়ায় লোদীর মেয়র হওয়ার বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত রয়েছে। কেননা, সিসিকের মেয়র পদে আগে থেকেই প্রচারাভিযানে আছেন নাসিম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী। তাদের দুজনের মধ্যে ভালো বোঝাপোড়াও রয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, বর্তমান নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী তার পূর্বের নির্বাচিত সভাপতি নাসিম হোসাইনকে নিয়ে মাঠে দলের কাজ করতে আগ্রহী।

নাসিম হোসাইন জানান, তিনি ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন। আর দেশে ফিরেছেন একই বছরের ২৬ আগস্ট। দেশে আসার পর তিনি দলীয় সকল কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু দলের নির্দেশনা ছিল, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সিলেট মহানগর কমিটির দায়িত্বে থাকবেন। সম্প্রতি দলের পূর্বের সকল সিদ্ধান্ত নতুন করে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাই সিলেট মহানগর বিএনপির নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে কেন্দ্র থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়।

নাসিম হোসাইন বলেন, ‘আমাকে তো দল কখনও বহিষ্কার করেনি। আমার নির্বাচিত সভাপতি পদও স্থগিত করা হয়নি। বিদেশ থেকে দেশে ফিরে দলকে জানিয়েছি। সাংগঠনিক নিয়ম ও গঠনতন্ত্র অনুসারে নির্বাচিত সভাপতি তার পূর্বের স্থানে ফিরে এলে ভারপ্রাপ্ততো থাকার সুযোগ নাই। তিনি (লোদী) সবই জানেন, তবু না জানার ভান করছেন। গত বছরের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সভাপতি পদটি ‘শূন্য’ রেখে ১৭১ সদস্যের পরিবর্তে ১৭০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। তার মানে আমার নির্বাচিত পদ খালি রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, আমি ফিরে এলে সভাপতি তো আমার থাকার কথা।

জানতে চাইলে সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, ‘আমাকে দলের কেন্দ্র থেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়েছিল। এখন কেন্দ্র থেকে নতুন কোনো বিজ্ঞপ্তি আসেনি। তাই আমি মনে করি, এখনও আমি সভাপতি আছি। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নাসিম হোসাইনের নাম ছিল না, তাই সভাপতি পদে নতুন কোনো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কেন্দ্র থেকে আসেনি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘দলের সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী নাসিম হোসাইন নির্বাচিত সভাপতি। তিনি ফিরে এসেছেন, এখন তিনিই সভাপতি।’

প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ১০ মার্চ সম্মেলনে ভোটের মাধ্যমে মহানগর বিএনপির সভাপতি পদে নাসিম হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক পদে ইমদাদ হোসেন চৌধুরী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে সৈয়দ সাফেক মাহবুব নির্বাচিত হয়েছিলেন।

মূল রিপোর্ট: দৈনিক সিলেটের মানচিত্র