যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ শুক্রবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে আনা হয়েছে। শনিবার সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে। জানাযায় অংশ নিতে ইতোমধ্যে ইরানে পৌছেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি ইরানের স্পিকারের সঙ্গে শুক্রবার বৈঠক করে খামেনী হত্যার তীব্র নিন্দাও জ্ঞাপন করেন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত জানাজায় কয়েক কোটি মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তেহরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ খামেনির জানাজায় জনগণকে ব্যাপকভাবে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, ইরানের ত্রিবর্ণ পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিন শোকাহত মানুষ কাঁধে করে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক ভেন্যু গ্র্যান্ড মোসাল্লায় নিয়ে যাচ্ছেন।
অন্য ছবিতে দেখা যায়, জানাজার আগের অনুষ্ঠানে কালো পোশাক পরা মানুষের ঢল। লাল ফুলের সাজসজ্জা ও বাতাসে ঝুলন্ত সাদা প্রজাপতির পটভূমিতে কফিনটি রাখা হয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত বন্ধে যখন একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে, তখন খামেনির জানাজার প্রস্তুতি চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানায়, দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
চীন, আফগানিস্তান এবং ককেশাস অঞ্চলে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোও প্রতিনিধি পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রস্তুত করতে ব্যস্ত ছিলেন কর্মীরা। নিরাপত্তা বাহিনী চলাচলকারী গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছিল। কৌতূহলী মানুষও সেখানে ভিড় করেন।
মাথায় টুপি ও মুখে স্কার্ফ জড়িয়ে কাজ করা কর্মী হোসেইন মোঘাদ্দাসি বলেন, ‘আমরা আমাদের শহীদ নেতার বিদায় অনুষ্ঠানের জন্য ফুলের গাছ লাগাচ্ছি ও গাছে পানি দিচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘ইরানের সব প্রান্ত থেকে মানুষ আসবে। বিশাল জনসমাগম হবে।’
তেহরানের প্রধান আলোচক ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ইতিহাসে গৌরবময় একটি অধ্যায় রচনায় আমি সমগ্র ইরানি জনগণকে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিশোধের জন্য জাতির আহ্বান পুরো বিশ্বের কানে পৌঁছাতে হবে।’
অনেক শিয়া মুসলমানের আধ্যাত্মিক নেতা খামেনি রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রস্থলে তাঁর কমপ্লেক্সে চালানো হামলায় ৮৬ বছর বয়সে নিহত হন।
তাঁর মরদেহ তিন দিন গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হবে। বিশাল এ কমপ্লেক্সটি খামেনির ছবি ও উদ্ধৃতিসংবলিত ব্যানারে সাজানো হয়েছে। হামলায় নিহত তাঁর স্বজনদের মরদেহও সেখানে রাখা হবে।
কর্মকর্তাদের ধারণা, জানাজায় দেড় কোটি থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নেবে। সে ক্ষেত্রে এটি হবে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় জানাজা ।
গালিবাফ একে ইরানের ইতিহাসের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটি’ বলে মন্তব্য করেছেন।
অনুষ্ঠান চলাকালে তেহরানের পাশাপাশি পবিত্র নগরী কোম ও মাশহাদে সরকারি ছুটি থাকবে। এ দুই শহরে পরবর্তী ধাপের জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হবে।
কর্তৃপক্ষ শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিস বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে যান চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় শহরের কেন্দ্রের বড় অংশ ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য বিধিনিষেধ থাকবে।
শুক্রবার থেকে তেহরানের আকাশসীমা আংশিক ও সোমবার পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
তেহরানের অনুষ্ঠান শেষে খামেনির মরদেহ ইরাকের পবিত্র নগরী নাজাফ ও কারবালায় নেওয়া হবে। এরপর ৯ জুলাই তার জন্মস্থান ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে তাকে দাফন করা হবে।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জনসমক্ষে না আসা খামেনির ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতাবা খামেনি তেহরানের মূল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কি না, তা এখনও জানা যায়নি।
প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধিদের জানাজায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিবেশী ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে মানুষের ঢল নামবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দাফনের আনুষ্ঠানিকতা চলবে সাত দিন:
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সাত দিনব্যাপী দাফনের আনুষ্ঠানিকতা আজ শুক্রবার শুরু হয়েছে। লাখ লাখ শোকাহত মানুষ এতে অংশ নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, শোকসভা ও শোকমিছিলের আয়োজন করা হয়েছে।
গত মার্চে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন হওয়ার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তা পিছিয়ে দেওয়া হয়।
৮৬ বছর বয়সী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের প্রথম দিন নিহত হন। ওই হামলায় তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান। ওই সময় তিনি তেহরানে তাঁর আবাসিক ভবনে ছিলেন।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কে:
ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। তিনি দেশটিতে ইসলামি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন।
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক নেতৃত্ব দিলেও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামোকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এই শেষকৃত্য আরেকটি কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি হবে তাঁর উত্তরসূরি ও ছেলে মোজতবা খামেনির অধীনে প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর গত চার মাস ধরে তিনি জনসমক্ষে খুব কমই দেখা দিয়েছেন।
আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তবে যুদ্ধের প্রথম দিনের হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন। এর পর থেকে তিনি একবারও জনসমক্ষে আসেননি।
সাত দিনব্যাপী অনুষ্ঠান:
শুক্রবার তেহরানে শুরু হচ্ছে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার আনুষ্ঠানিকতা। ইরান ও ইরাকে নানা ধর্মীয় আয়োজনে সাত দিন এই আনুষ্ঠানিকতা চলবে। এতে বিভিন্ন দেশের নেতা, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা পণ্ডিতেরা অংশ নিয়ে খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
৪ ও ৫ জুলাই তেহরানে সর্বসাধারণের জন্য জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। সাধারণ মানুষের বিদায় জানানোর সুবিধার্থে খামেনি এবং তাঁর পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের কফিন তেহরানের প্রধান ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় সমাবেশস্থল গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হবে।
৬ ও ৭ জুলাই খামেনির মরদেহ নিয়ে একটি শোকমিছিল তেহরানের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করবে। পরে তা রাজধানী থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কোম শহরের উদ্দেশে যাত্রা করবে।
কোম ইরানের শিয়া ইসলামি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এবং দেশটির অন্যতম পবিত্র শহর। এখানে ইরানের বৃহত্তম ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অবস্থিত। হাজারো আলেম ও শিক্ষার্থী সেখানে পড়াশোনা ও গবেষণা করেন। আলী খামেনিও জীবনের একটি পর্যায়ে এখানেই অধ্যয়ন করেছিলেন।
ইরান ও ইরাকের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৮ জুলাই ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খামেনির মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হবে। এরপর নাজাফ ও কারবালা শহরে জনসাধারণের শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
নাজাফে অবস্থিত ইমাম আলীর মাজার শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান। প্রতিবছর সেখানে লাখো শিয়া ধর্মানুরাগী সমবেত হন। বিশ্বাস করা হয়, সেখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) চাচাতো ভাই, জামাতা হজরত আলী ইবনে আবি তালিবের (রা.) সমাধি রয়েছে।
অন্যদিকে কারবালায় অবস্থিত ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর সৎভাই আব্বাসের মাজারও শিয়া সম্প্রদায়ের সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে মুহাম্মদ (সা.)–এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন ও আব্বাস নিহত হন।
সবশেষে ৯ জুলাই খামেনির মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। সেদিন মাশহাদের ইমাম রেজার মাজারে তাঁকে দাফন করা হবে।
মাশহাদ ইরানের সবচেয়ে পবিত্র শহর হিসেবে বিবেচিত। ইমাম রেজা শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমাম।
এই শহরের সঙ্গে খামেনির ব্যক্তিগত সম্পর্কও গভীর। ১৯৩৯ সালে মাশহাদেই তাঁর জন্ম। শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় তিনি এই শহরে কাটিয়েছেন। এখানকার ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পর তিনি উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য কোমে যান।
শিয়া ইসলামের অন্যতম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ইমাম রেজার মাজারের পাশে সমাহিত হওয়া অত্যন্ত সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখা হয়।