লিখেছেন-মুফতি হাবিবুর রহমান::
মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর ছিয়াম ফরয করা হল, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমশীল হতে পার’ (বাক্বারাহ ১৮৩)।
রামাযানের রোজা আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর বান্দাদের জন্য একটি বিশেষ নেয়ামত। রহমত, বরকত ও মাগফিরাতে পরিপূর্ণ এ মাসে আমাদের কিছু করণীয় রয়েছে।
(১) নফস ও শয়তানের কু-মন্ত্রণা হতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখাঃ
মানুষের অন্তর মন্দপ্রবণ। আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই মানুষের মন মন্দপ্রবণ’ (ইউসুফ ১২/৫৩)। অপরদিকে শয়তান সর্বদা মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্যস্ত রয়েছে। আল্লাহ শয়তানের ভাষ্য উল্লেখ করে বলেন, ‘আপনার ইয্যতের কসম! আমি অবশ্যই তাদের সবাইকে বিপথগামী করব’ (ছোয়াদ ৩৮/৮২)। সুতরাং ইবাদতের ক্ষেত্রে অন্তরায় হ’ল মানুষের নফসে আম্মারা ও শয়তানের কু-মন্ত্রণা। এই মাসে যদিও শয়তান শৃংখলিত থাকে তবুও ষড়রিপুর তাড়নায় মানুষ অন্যায় ও পাপ করে বসে। অনেক সময় নিজেকে ইবাদতে মশগূল রাখতে পারে না। তাই এই বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন হয়ে তা মোকাবেলা করতে হবে।
(২) পূর্ববর্তী রামাযানের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করাঃ
রামাযানের ফযীলত লাভ করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে হবে। ইবাদতের মাধ্যমে রামাযানে নিজেকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করতে না পারলে তা হবে চরম ব্যর্থতা। হযরত মালেক ইবনুল হুওয়াইরিছ (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মিম্বরে আরোহণ করলেন। অতঃপর ১ম সিঁড়িতে পা দিয়ে বললেন, আমীন! ২য় সিঁড়িতে পা দিয়ে বললেন, আমীন! এরপর ৩য় সিঁড়িতে পা দিয়ে বললেন, আমীন! লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে তিন সিঁড়িতে তিন বার ‘আমীন’ বলতে শুনলাম। তিনি বললেন, আমি যখন ১ম সিঁড়িতে উঠলাম, তখন জিব্রীল আমাকে এসে বললেন, হে মুহাম্মাদ! যে ব্যক্তি রামাযান মাস পেল। অতঃপর মাস শেষ হয়ে গেল। কিন্তু তাকে ক্ষমা করা হ’ল না, সে জাহান্নামে প্রবেশ করল। আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন। আমি বললাম, আমীন’! ২য় সিঁড়িতে উঠলে জিব্রীল বললেন, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বা তাদের একজনকে পেল। অথচ সে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করল না, সে জাহান্নামে প্রবেশ করল। আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন। আমি বললাম, আমীন! অতঃপর ৩য় সিঁড়িতে পা দিলে তিনি বললেন, যার নিকটে তোমার কথা বলা হ’ল, অথচ সে তোমার উপরে দরূদ পাঠ করল না। অতঃপর সে মারা গেল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করল। আল্লাহ তাকে স্বীয় রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন। তুমি বল, আমীন। আমি বললাম, আমীন’!
(৩)আল্লাহর নিকট তাওফিক কামনা ও কঠোর পরিশ্রম করাঃ
রামাযানে ছিয়াম পালন ও ফরয ছালাত সহ অধিক নফল ছালাত আদায় করার চেষ্টা করা এবং এজন্য আল্লাহর নিকটে তওফীক কামনা করতে হবে। কেননা এ মাসে বেশী বেশী ছিয়াম-ক্বিয়ামের গুরুত্ব অপরিসীম।
তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, দু’ব্যক্তি দূর-দূরান্ত থেকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট আসলো। তারা ছিল খাঁটি মুসলমান। তাদের একজন ছিল অপরজন অপেক্ষা শক্তিধর মুজাহিদ। তাদের মধ্যকার মুজাহিদ ব্যক্তি যুদ্ধ করে শহীদ হল এবং অপরজন এক বছর পর মারা গেল। তালহা (রাঃ) বলেন, আমি একদা স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি জান্নাতের দরজায় উপস্থিত এবং আমি তাদের সাথে আছি। জান্নাত থেকে এক ব্যক্তি বের হয়ে এসে তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরে মারা গিয়েছিল তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিল। সে পুনরায় বের হয়ে এসে শহীদ ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিল। পরে সে আমার নিকট ফিরে এসে বলল, তুমি চলে যাও। কেননা তোমার (জান্নাতে প্রবেশের) সময় এখনও হয়নি, তোমার পালা পরে। সকাল বেলা তালহা (রাঃ) উক্ত ঘটনা লোকেদের নিকট বর্ণনা করলেন। তারা এতে বিস্ময়াভিভূত হ’ল। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কানে গেল এবং তারাও তাঁর কাছে ঘটনা বর্ণনা করল। তিনি বললেন, কি কারণে তোমরা বিস্মিত হ’লে? তারা বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ব্যক্তি তাদের দু’জনের মধ্যে অধিকতর শক্তিধর মুজাহিদ। তাকে শহীদ করা হয়েছে। অথচ অপর লোকটি তার আগেই জান্নাতে প্রবেশ করল! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, অপর লোকটি কি তার পরে এক বছর জীবিত থাকেনি? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, সে একটি রামাযান মাস পেয়েছে, ছিয়াম রেখেছে এবং এক বছর যাবত এই এই ছালাত কি পড়েনি? তারা বলল, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আসমান-যমীনের মধ্য যে ব্যবধান রয়েছে, তাদের দু’জনের মধ্যে রয়েছে তার চেয়ে অধিক ব্যবধান’।
উপরোক্ত ফযীলত লাভ করার জন্য আল্লাহর কাছে তাওফীক ও সাহায্য চাইতে হবে। সেই সাথে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজে সফল হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
(৪) পরস্পরের মধ্যে বিদ্যমান বিবাদ মীমাংসা করে নিতে হবেঃ
রামাযানে মহান আল্লাহ অনেক মানুষকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু যাদের মাঝে বিবাদ-বিসম্বাদ আছে, তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না তারা তাদের মধ্যকার বিবাদ মিটিয়ে নেয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা খোলা হয় এবং প্রত্যেক বান্দাকে ক্ষমা করা হয় এ শর্তে যে, সে আল্লাহ তা‘আলার সাথে কোন কিছুকে অংশীদার করবে না। আর সে ব্যক্তি এ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়, যে কোন মুসলিমের সাথে হিংসা ও শত্রুতা পোষণ করে। ফেরেশতাদেরকে বলা হয় যে, এদের অবকাশ দাও, যেন তারা পরস্পর মীমাংসা করে নিতে পারে’।
(৫) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্খাঃ
প্রত্যেক ছায়েমের উচিত শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ছিয়াম পালন করা। কারণ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা না হলে তা কবুল হবে না। রামাযানের ছিয়াম পালন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সাধনা। কেননা এ ইবাদতে লোক দেখানোর অহেতুক অভিলাষ থাকে না। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ছিয়াম পালন করার মাধ্যমেই বান্দা তার কাঙ্খিত পুরস্কার লাভ করতে পারে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য একদিন ছিয়াম পালন করবে, আল্লাহ জাহান্নামকে তার নিকট হতে একশত বছরের পথ দূরে সরিয়ে দিবেন’।
(৬) আত্মশুদ্ধি অর্জনের প্রচেষ্টাঃ
রামাযান মাস হচেছ আত্মশুদ্ধি অর্জনের মাস। সকল পাপাচার-অনাচার দূরে ঠেলে দিয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করার মাধ্যমে নেকী অর্জনের মাস। কেননা মাহে রামযানের মূল আবেদনই হ’ল সর্বোতভাবে আল্লাহমুখী হওয়া। তাই প্রত্যেক ঈমানদারের অবশ্য কর্তব্য হ’ল এ মাসে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহভীতি অর্জনের চেষ্টায় লিপ্ত হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের উপর ছিয়াম ফরয করা হয়েছে যেন তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পার’ (বাক্বারাহ ১৮৩)।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে উপরোক্ত বিষয়গুলো পালনের মাধ্যমে রামাযানের বরকত হাছিলের তাওফীক দান করুন। আমীন
লেখক: ইসলামি আলোচক