এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ হাওর হাকালুকি। হাওরের কুলাউড়া উপজেলা অংশে বিভিন্ন স্থানে কৃষকরা বোরো ধান কাটতে শুরু করেছেন। বর্তমানে বোরো ধান কাটার আরো কিছুটা সময় বাকী থাকলেও হাওরে ধান কাটা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ধান কাটার সময় উপযোগী হলেও, কৃষকের মনে নেই স্বস্তি-বরং আছে আতঙ্ক আর নানা উৎকণ্ঠা। চৈত্রের শুরুতে প্রচন্ড খরায় জমি ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছিলো, সেই সময় বৃষ্টির জন্য কৃষকরা হাওরে প্রার্থনা শুরু করে।
আর এখন সেই বৃষ্টিই যেন হয়ে উঠেছে এখন কৃষকের দুঃস্বপ্ন। সাম্প্রতিক সময়ে লাগাতার শিলাবৃষ্টি, ঝড় আর দমকা হাওয়ায় হাওরজুড়ে তৈরি হয়েছে এক অজানা শঙ্কা। হঠাৎ বন্যা আর অতিবৃষ্টির আশঙ্কায় কৃষকরা বাধ্য হচ্ছেন তাদের কাঁচা-পাকা ধান কেটে ফেলতে। হাওরে ধান কাটা শুরু করলেও বিপাকে পড়েছেন ধান মাড়াই নিয়ে। অন্যান্য বছর সহজেই মাড়াই মেশিনগুলো হাওরে গিয়ে ধান মাড়াই করলেও এবার বৈশ্বিক যুদ্ধের কারনে তেলের সংকট থাকায় মাড়াই মেশিনগুলো অনেকটা অলস হয়ে পড়েছে।
হাওরের যে জমিগুলোতে লুকিয়ে আছে কৃষকের ঘাম, শ্রম আর সংগ্রামের গল্প। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি আর জালানি সংকটে সেই হাওরের কৃষকরা দাঁড়িয়ে আছেন নানা অনিশ্চয়তার দ্বারপ্রান্তে। যেখানে প্রতি বছর হাওরে ধান সংগ্রহ করে মাঠেই মাড়াই করা হতো, সেখানে এবার স্তূপ করে রাখা হচ্ছে কাটা ধান। আর সেই ধানের ওপরেই প্রতিদিন ঝরছে বৃষ্টি- ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে প্রতিনিয়ত।
হাওর পাড়ের কৃষক জিয়াউর রহমান, মারুফ মিয়া, ফজলু মিয়া, জায়েদ আহমদ, লালা মিয়া, মো: ফারুক মিয়া, আলমাছ মিয়া, আব্দুল মতিন, বদরুল ইসলাম ও ছালেক মিয়া বলেন, ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বন্যার আশংঙ্কায় কাচা-পাকা ধান জমি থেকে কেটে ফেললেও ধান মাড়াই নিয়ে তাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সংকট থাকায় ধান মাড়াই মেশিনগুলো হাওরে যেতে পারছে না। এজন্য কৃষকরা সরকারের কাছে এবার ধানের মূল্যবৃদ্ধির দাবি জানান।
স্থানীয়দের মতে, হাওরাঞ্চলে ধান উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াই জ্বালানিনির্ভর। ধান কাটা থেকে শুরু করে মাড়াই পর্যন্ত ডিজেল ব্যবহার করতে হয়। শ্রমিক সংকটের কারণে বর্তমানে ধান কাটায় কম্বাইন হার্ভেস্টারের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে ডিজেলচালিত। তেল সংকটের কারণে মাড়াই মেশিন হাওরে পৌঁছাতে পারছে না। যারা নিয়ে গেছেন, তারাও দিনের পর দিন বসে আছেন তেলের অপেক্ষায়।
কুলাউড়া উপজেলার ভূকশিমইল ইউনিয়নের হাকালুকি হাওর থেকে উঠে এসেছে এমনই চিত্র। কৃষকেরা বলছেন-‘ধান কাটছি, কিন্তু মাড়াই করতে পারছি না। তেলের অভাবে সবকিছু থমকে গেছে।’ অথচ, কিছুদিন আগেও ছিল ভিন্ন চিত্র। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ সময় আর সংকটের সঙ্গে লড়াই করে- হাওরের কৃষকরা বাঁচাতে চাইছেন তাদের সোনালি ফসল। প্রশ্ন একটাই- এই দুর্দিনে কৃষকের পাশে কে দাঁড়াবে।
এ ব্যাপারে কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, হাকালুকি হাওর কুলাউড়ার অংশে এবার ৪ হাজার ৮শত ৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাধ করা হয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা ঝড়-বৃষ্টির কারনে বন্যার আশংঙ্কায় অনেকেই আগাম ধান কাটা শুরু করেছেন। তবে আমাদের নির্দেশনা ধান ৮০ভাগ চলে আসলে কাটতে অসুবিধা নেই।
কৃষি অফিস থেকে সরেজমিন হাওরে গিয়ে আমরা ধান মনিটরিং করছি। হাওরে কৃষকদের ধান কাটার জন্য ১২টি কম্বাইন্ড হারবেষ্টার মেশিন দেওয়া হয়েছে। এবং তাদের জ্বালানি প্রয়োজনের জন্য কৃষি অফিস থেকে প্রতি গাড়িতে ১০০ লিটার করে তেল সরবারহের জন্য পেট্রোল পাম্মগুলোতে বিশেষ স্লিপ দেওয়া হয়েছে।