আজ বুধবার, ২০শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অপরাধীদের ‘অভয়ারণ্য’ সিলেট, ১৮ মাসে ৭০ছিনতাই

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত মার্চ ১১, ২০২৬, ০১:০২ পূর্বাহ্ণ
অপরাধীদের ‘অভয়ারণ্য’ সিলেট, ১৮ মাসে ৭০ছিনতাই

মূল রিপোর্ট-দৈনিক শ্যামল::

ভাল নেই আধ্যাত্বিক নগরী সিলেট। পর্যটন অধ্যুষিত এই অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেনো দিন দিন নাজুক হয়ে পড়ছে। সিয়াম সাধণার মাস পবিত্র মাহে রমজানের দিনগুলো ফুরিয়ে আসছে। দোয়ারে কড়া নাড়ছে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। এরইমধ্যে ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন সিলেটের মানুষ। অন্যদিকে, অপরাধীরাও সক্রিয় হয়ে ওঠেছে। বেড়েছে ছিনতাই, রাহাজানি, অপহরণের মতো স্পর্শকাতর ঘটনা।

অপরাধীরা মানুষকে টার্গেট করে অস্ত্রের মুখে লুটে নিচ্ছে নগদ টাকাসহ সর্বস্ব। তাতে অনেকের ঈদ আনন্দ ম্লান হয়ে যাচ্ছে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে। দিনে কিংবা রাতে মানুষের অস্বস্থি বাড়িয়ে দিয়েছে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা। মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদে ঘরে ফেরা নিয়ে সংশয় তৈরী হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অপরাধ দমনে কঠোর হলেও অপরাধীদের লাগাম টেনে ধরতে পারছে না। এরই মধ্যে অন্তত ২শতাধিক অপরাপধীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলেও মানুষের নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আক্ষরিক অর্থে অপরাধীরা প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটকে টার্গেট করে যেনো জড়ো হয়েছে। ঈদ কেন্দ্রিক সিলেটের বাইরে থেকে অপরাধীচক্র বিভিন্ন স্থানে ওৎ পেতে আছে। সুযোগ পেলেই নিঃস্ব করে দিচ্ছে মানুষকে। প্রাণ ভয়ে অনেকে সব কিছু সমর্পন করছেন অপরাধীদের কাছে। তাই অনিরাপদ নগরে পরিণত হয়েছে সিলেট।

চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ, প্রতারণা, ধর্ষণ, হত্যা এবং যাত্রীবেসে লটতরাজসহ নানা অপরাধের নীরব স্বাক্ষী হতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রতি মূহুর্তে বাসিন্দাদের উদ্বেগ উৎকন্ঠায় পথ চলতে হয়। অনেকে অপরাধের শিকার হয়ে আইনী ঝামেলা এড়াতে পদক্ষেপে যেতে অনীহা দেখাচ্ছেন। পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের আধিপাত্য ভাবিয়ে তুলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও। নগরীর অলিতে গলিতে জুয়া ও মাদকের প্রভাব অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। মাদক ও অনলাইনে জুয়ার অর্থ যোগান দিতে গিয়ে সভ্য ঘরের ছেলেরাও অভিভাবকদের অদেখায় ছিনতাই, রাহাজানিতে জড়াচ্ছে। নগরীতে অপরাধীদের অবস্থানের পরিসংখান রীতি মতো গা শিউরে ওঠার মতো।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, অপরাধ সংশ্লিষ্ট বেশির ভাগ কিশোর বয়সের যা কিশোর গ্যাং নামে পরিচিত। এসব অপরাধীরা বেশিরভাগ রয়ে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। অনেকে নেতাদের সাথে যুক্ত ছবি ব্যবহার করে দলীয় পরিচয় দিয়ে পুলিশকে ধোকা দিচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় অপরাধীচক্রের সদস্য হিসেবে থাকা বেশিরভাগই বহিরাগত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, বেশিরভাগ অপরাধীর টার্গেট নারীরা। যারা একা চলা ফেরা করেন। এছাড়াও ব্যবসায়ী ও পথচারীদেরও ছিনতাইয়ের নিশানা বানানো হয়। সাম্প্রতিক ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করেও এমনটি দেখা গেছে।

হঠাৎ করে অপরাধী বেড়ে যাওয়ার ছেছনে বিগত দিনের মব ভায়োলেন্সকেও দায়ি করছেন অনেকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে পুলিশের দুর্বল মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে এসব অপরাধ নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেছে, মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের দুটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় গোটা নগরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনটি মোটর সাইকেল যোগে সশস্ত্র ছয়জন ছিনতাইকারী নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকায় জনৈক মহিলার কাছ থেকে ব্যাগভর্তি টাকা ছিনিয়ে নেয়। ওই মহিলা সিএনজি অটোরিকশা যোগে যাওয়া পথে দিনদুপুরে এ ঘটনা ঘটে। এখনো এই ঘটনার কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। ওই ঘটনার ৯দিনের মাথায় সাগরদিঘির পাড়ে আরেক মহিলাকে দুই মোটর সাইকেলযোগে ৪ জন ছিনতাইকারী দেশীয় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা ছিনিয়ে নেয়।

গত বছরের ২৬ অক্টোবর নগরীর দক্ষিণসুরমা এলাকার কদমতলী থেকে এনা পরিবহনের কর্মকর্তা ছিনতাইয়ের শিকার হন। ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ছিনতাই করা হয়। ৫টি মোটর সাইকেল যোগে ১০ জন ছিনতাইকারী ধারালো অস্ত্রের মুখে এই অপরাধ সংগঠিত করে।

এনা পরিবহনের ম্যানেজার শফিকুল ইসলামের গণমাধ্যমকে জানান, ওই সময় ছিনতাইয়ের সাথে জড়িতরা হেলমেট পরিহিত ছিল এবং তাদের কাছে লম্বা দা ছিল। ঘটনার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত ঘটনার সাথে সরাসারি সম্পৃক্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করলেও তারা আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানিয়েছে নগর পুলিশের মুখপাত্র। এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সারাদেশে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

ছিনতাইয়ের ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িতদের গ্রেফতার করতে না পারলেও গত কয়েকদিনের পুলিশি অভিযানে অন্তত ২শতাধিক অপরাধীকে আটক করা হয়। যা নগরবাসীর মধ্যে স্বস্তি তৈরি হলেও সংশয় কাটছে না। গত ৯৬ ঘন্টায় অপরাধে জড়িত সন্দেহে ২ শতাধিক লোকজনকে আটক করা হয়েছে। যারা সিলেট নগরীর বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করতো। বিশেষ করে, রোববার সন্ধ্যায় নগরীর তাঁতীপাড়া এলাকায় এক ব্যাক্তিকে অপহরণ করে মুক্তি পণের ঘটনায় ১০ জনকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা কিশোর গ্যাংয়ের সাথে জড়িত। জড়িত অপরাধীর বেশির ভাগের সাথে বর্তমান সরকার দলীয় রাজনীতিবিদদের সংস্পর্র্শে যাতায়াতের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তবে অপরাধ ধমনে বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্সের বিষয় উল্লেখ করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে তাগিদ দিয়েছেন দায়িত্বশীলরা।

প্রকাশ্যে দিবালোকে অস্ত্রের সম্মুখে ছিনতাইকারীদের এমন দাপট নগরবাসীরর মনে ভীত সঞ্চার করেছে। কেননা ছিনতাইয়ের সাথে সরাসরি জড়িত এসব অপরাধীদেরকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এমনকি যদিও তারা দিনরাত নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে তল্লাসি চৌকি বসিয়ে দায়িত্বপালন করে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে গত শনিবার আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রশাসনের প্রতি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেন ।

তিনি বলেন, অপরাধীকে গ্রেফতারের পর কেউ ছাড়ানোর তদবির করলেও তাকেও যেনো গ্রেফতার করা হয়। অপরাধী কোন দলের নেতা বা কর্মী তা দেখা বিবেচ্য নয়।

অপরদিকে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য শিল্প ও বাণিজ্য এবং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং সিসিকের পূর্ণকালিন প্রশাসক আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী সম্প্রতি সংঘটিত ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনতিবিলম্বে এসব অপরাধীদের কে আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন।

বিশিষ্ট আইনজীবি ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট শিপন আহমদ বলেন, গ্রেফতারকৃতরা হয়তো সাময়িক কারাগারে থাকবে। কিন্তু সাক্ষ্য প্রমাণের অভাবে একটা সময় তারা আবারও বেরিয়ে আসে। এসব ঘটনায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেউ স্বাক্ষী হতে চায়না। যার ফলে অপরাধীদের শাস্তির পরিসংখ্যান নগন্য।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিসিস্থি নিয়ন্ত্রনে রাখতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি অপরাধীদের বিরুদ্ধে। নগরবাসীর স্বস্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এসএমপির উপ কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, গত তিন দিনে এসএমপির অভিযানে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত প্রায় ২ শতাধিকের বেশি লোকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ৫০ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে । শুধুমাত্র ২৪ ঘন্টায় ৭০ জনকে গ্রেফতারের তথ্য রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ মার্চ থেকে ২০২৬ এর মার্চ পর্যন্ত চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৪৫টি এবং দস্যুতা বা ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ১৭টি। তবে এসব মামলায় ঠিক কতোজন আসামি গ্রেফতার হয়েছেন তার বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এসএমপি মিডিয়া সূত্রে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত সিলেট মহানগরী এলাকায় হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২৫টি যেখানে আসামির সংখ্যা ৫শ’র অধিক গ্রেফতার অর্ধশতাধিক ধর্ষন মামলার সংখ্যা ৫৬টি অভিযুক্তের সংখ্যা ৮০ জন, গ্রেফতার হয়েছেন ৫২ জন। এর মধ্যে ১৪টি বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ছিনতাই ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫১টি । যেখানে ১৯টি মামলা হয়েছিল শাহপরান থানায় এবং কোতোয়ালী থানায় ১৮টি মামলা। ৪শ’র অধিক যেখানে ১৪৪ জন অজ্ঞাতআসামি রয়েছেন। তন্মধ্যে ৬৭ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল এবং ৩৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ডাকাতির মামলা ওই সময়ে রেকর্ড করা হয় তিনটি। যেখানে ২৪ জন অভিযুক্তদের মধ্যে পুলিশ ১৪ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছিল। অপহরণ মামলা হয়েছিল ১৮টি। যেখানে অভিযুক্তের সংখ্যা ৭৭জন। এছাড়াও অজ্ঞাত আরো ১১৪ জন। তন্মধ্যে ১৬ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

মামলার ৮টি নিষ্পত্তি হয়েছে। চুরির ঘটনায় ওই সময়ে মামলা রেকর্ড হয় ১৫০টি যেখানে অভিযুক্তের সংখ্যা ১৭৫ জন এবং অজ্ঞাত নামা আরো ৩১জন। অভিযুক্ত গ্রেফতার সংখ্যা ১৯৯ জন। ওই মামলা গুলোর মধ্যে ৫৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে শাহপরান থানা এলাকায় ৪৬টি এবং তারপর কোতোয়ালী থানা এলাকায় ৪৪টি। ধর্ষণের ঘটনায় মামলা রেকর্ড হয়েছে ১৩টি যেখানে অভিযুক্তদের সংখ্যা ১৪ জন এবং গ্রেফতার হয়েছিল ১২জন। এসব তথ্য ছাড়াও অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় শুধুমাত্র ২০২৫ সালের জুলাই মাসে অপহরণ ৯টি , চুরি ৪৩টি, ছিনতাই ৭টি, ডাকাতি ১টি ঘটনা ঘটেছে। বিগত ১৩ মাসের ৫৮টি ছিনতাই মামলার পরিসংখ্যানের হিসেবে প্রতি মাসে গড়ে ৫টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে সিলেট নগরীতে। আর এসব ছিনতাইর ঘটনায় গড়ে জড়িত থাকছে ৭ থেকে ৮ জন ছিনতাইকারী।

২০২৫ সালের মাচ মাস থেকে থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ১৮টি। সেই হিসেবে প্রতিমাসে ১টির বেশি ছিনতাই সংঘটিত হচ্ছে সিলেট নগরীতে।

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১