সহপাঠিদের সামনে শিক্ষক কর্তৃক অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহনন করে স্কলার্সহোম কলেজের শাহী ঈদগাহ ক্যাম্পাসের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আজমান আহমেদ দানিয়েল। তার মৃত্যু ঘিরে ক্যাম্পাসে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। অনাকাঙ্খিত এই মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভে ফুসে ওঠেছেন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা।
অভিভাবকদের সাথে অদাচরণ আর কোন অবস্থায় মেনে নেবে না বলেও হুসিয়ারি দেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
রোববার স্কলার্স হোম কলেজের শাহী ঈদগাহ ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষকে তারা ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দেন। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অসদাচরনের অভিযোগ এনে কলেজ কর্তৃপক্ষকে ৫ দফা দাবি জানিয়েছে বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা। এসময় অনেক অভিভাবকও তাদের কর্মসূচীতে সংহতি জানান।
কলেজের উপাধ্যক্ষসহ তিনজন শিক্ষকের অনতিবিলম্বে পদত্যাগ চেয়েছেন তারা। অভিযুক্ত তিন শিক্ষকরা হলেন- উপাধ্যক্ষ আশরাফ হোসেন চৌধুরীর, শ্রেণী শিক্ষক শামিম হোসেন ও সিনিয়র শিক্ষিকা তাইবা।
পরবর্তীতে উক্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে কোনো শিক্ষার্থীকে ব্যাক্তিগতভাবে কোনো সমস্যার সম্মুখীন কিংবা হেনস্তা করা না হয়, সে বিষয়ে তারা দাবি জানান এবং আজমানের আকস্মিক মৃত্যুতে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার কারনে পড়াশোনায় ব্যাপক ক্ষতিসাধন হওয়ায় আসন্ন টেষ্ট পরীক্ষায় মারাত্মক প্রভাব পরবে বিধায় এইচএসসি বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যেনো কোন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি করা না হয়।
এছাড়াও কলেজের নোটিশ বোর্ডে টানানো শিক্ষার্থী আজমান আহমেদ দানিয়েলের মৃত্যুর ব্যাপারে সংবাদ বিবৃতি সরাতে বলা হয়। কলেজের তিন শিক্ষকের পদত্যাগ ও অপসারনের বিষয়েও কারন উল্লেখ করেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেন স্কলার্সহোম শাহীঈদগাহ শাখার অধ্যক্ষ লে.কর্ণেল (অবঃ) মুনির আহমেদ কাদেরী।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যে দাবি জানিয়েছে, আমরা তা মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছি। আজমানের আত্মহননের ঘটনায় যদি কলেজ কর্তৃপক্ষের কারও দায় পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আজকে আমরা ট্রাস্টি বোর্ডের আমাদের আজকে জরুরী সভা হয়েছে।
প্রতিষ্টান কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে শিক্ষার্থী বা তার অভিভাবকের সাথে কোন প্রকার অসদাচরণ করা হয়েছে কিনা, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। এমন কি ঘটনার দিন শিক্ষার্থী আজমান কলেজে এসেছে কিনা তাও তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। তিনি আরো বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখা সম্ভব হয়নি এখন পর্যন্ত। তবে শিক্ষকদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, ঘটনার দিন আজমানের সাথে কোন শিক্ষকের ওইদিন কোন স্বাক্ষাত হয়নি।
স্কলার্স হোম কলেজ ক্যাম্পাসে উপস্থিত একাধিক অভিভাবক দাবি করেন, পরীক্ষায় ভালা ফলাফলের বিষয়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের উপর নানা মুখি চাপ তৈরি করা হয়। দুর্বল শিক্ষার্থীদেরকে আলাদা করে কোন যত্ন নেয়া হয় না। যার ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ব্যবধান গড়ে ওঠে। সবার মেধা সমান না।
আপনারা শিক্ষার্থীদের প্রতি মানবিক না হয়ে শুধুমাত্র নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে বোর্ড পরীক্ষায় সেরা দেখানোর প্রতিযোগিতা করার কারনে আজ বাংলাদেশে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন বিপন্ন হচ্ছে। অনেকেই শিক্ষার্থী অকালে ঝড়ে পড়ছে শিক্ষাজীবন থেকে।
দ্বাদশ শ্রেণির একজন অভিভাবক বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এরকম অত্যাচারের শেষ হওয়া প্রয়োজন। আর যেন কোন আজমানকে আমরা হারাতে না হয়। মানুষ মরণশীল। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যুর দায় আমরা এড়াতে পারিনা। দীর্ঘদিন আমরা প্রতিষ্ঠানে টাকা পয়সা দেই এই কারনে যে, তারা যেন আমাদের সন্তানদের গড়ে তুলে।
কিন্তু সারা বছর না পড়িয়ে শুধুমাত্র পরিক্ষার সময় তাদের জন্য চাপ তৈরি করা হয়। এতে করে অনেক সন্তানেরা আর উত্তির্ণ হতে পারে না। এটা হয় মূলত তাদের লোভ লালসার কারনে। তারা চায় সব সময মানুষ কে দেখাতে যে তাদের ফলাফল খুব ভাল। এগুলো ঠিকনা। হয়তো আপনার শতকরা পাশের হার একটু কম থাকতো কিন্তু আজমানের মত কাউকে আমরা হারাতে হতো না।
এদিকে শিক্ষার্থীরা আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে তাদের দাবি বাস্তবায়নের জন্য কর্তৃপক্ষকে আল্টিমেটাম দেন। বিশেষ করে তিন শিক্ষকের অপসারণের বিষয়ে তারা তাদের উপাধ্যক্ষ আশরাফ হোসেনের পদত্যাগের কারন সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, শিক্ষার্থী আজমানের অবিভাবকের সাথে দফায় দফায় ন্যাক্কারজনক আচরন এবং আজমানকে মানসিক চাপ প্রয়োগ করা।
আজমানের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না দিয়ে বারবার তাকে হেনস্তা করার মাধ্যমে মানসিকভাবে তাকে বিধ্বস্ত করে দেয়া। শুধুমাত্র আজমানই নয়, বরং দেখা করতে যাওয়া সকল অবিভাবকের সাথে অকথ্য ভাষা ব্যবহার করে অপমান করে তারিয়ে দেয়া।
বিঃদ্র-শিক্ষার্থীরাউল্লেখ করেন যে, আজমানের মাকে” বাচ্চা ঘুম পারায় রেখে দেও, কলেজে আসার দরকার নাই” মন্তব্য করেন উপাধ্যক্ষ আশরাফ হোসেন। আজ আজমান তো সত্যিই চিরতরে ঘুমিয়ে গেলো!
সিনিয়র শিক্ষিকা তায়্যিবার পদত্যাগের কারন সম্পর্কে বলা হয়, দীর্ঘদিন যাবৎ প্রতিনিয়ত অবিভাবকদের সাথে অসদাচরণ করা। শিক্ষার্থীদের সাথে কুরুচিপূর্ণ
আচরণ করা এবং হেনস্তা করা যা তাদের মানসিক চাপ সৃষ্টির অন্যতম কারন। উপাধ্যক্ষ আশরাফ হোসেনের দেয়া সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সর্বদা সরাসরি উপস্থিত থেকে সমর্থনের মাধ্যমে প্রভাব সৃষ্টি করা।
আজমানের শ্রেণি শিক্ষক শামিম হোসেনের পদত্যাগের কারন সম্পর্কে শিক্ষার্থীও উল্লেখ করেন যে, প্রি-টেস্ট এর ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই আজমানকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা। শিক্ষার্থীদের ফলাফলের পর তাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো এবং যতাযত প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহেলা করে মানসিকভাবে চাপের মুখে ফেলা।
এছাড়াও শিক্ষার্থীরা কিছু সংস্কারের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের প্রতি আহবান জানান।
শিক্ষার্থীদের সংস্কার গুলো হলো-ভবিষ্যতে কোনো অবিভাবকের সাথে যেনো অসাদাচরন করা না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। আগামিতে কলেজ কর্তৃপক্ষের ব্যবহার এবং নীতি যেনো শিক্ষার্থীবান্ধব হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষা কমিটি রুটিন তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মতামতের যেনো গুরুত্ব দেয়া হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে।
রুটিনের ক্ষেত্রে ১৩ কার্যদিবসের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এনে অন্তত ২৬ কার্যদিবসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার্থীরা কোনো অভিযোগ দেয়ার কারনে প্রায়শই শিক্ষকরা ব্যক্তিগত আক্রোশের প্রতিফলন ঘটান একাডেমিক কার্যক্রম/ফলাফলে যা বন্ধ করা নিশ্চিত করতে হবে। ক্লাস ক্যাপ্টেন নির্ধারনের ক্ষেত্রে ভোট/নির্বাচনী পদ্ধতি অবলম্বন করে যোগ্য প্রতিনিধি নির্ধারন করতে হবে।