শেখ মুজিবকে যাঁরা জানতেন, চিনতেন ও বুঝতেন, তাঁদের অনেকেই বেঁচে নেই। আমিও কি পুরোপুরি জেনেছিলাম? যতটুকু জেনেছি ব্যক্তি মুজিবকে, জাতির পিতাকে, ততখানি অনুভব বা অনুধাবন করতে পারিনি। তবু আমার জানা, চেনা ও বোঝার বিষয়টিকে যতটুকু সম্ভব গুরুত্ব দিতে চাই। কারণ, শেখ মুজিবকে নিয়ে আলোচনায় কখনো ব্যক্তি মুজিবকে পরিচিত করানো হয় না।
জাতির পিতা শেখ মুজিব, স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিব, রাজনীতিবিদ ও একটি জাতিসত্তার প্রবক্তা, একটি স্বাধীন দেশের রূপকার, ব্যর্থ বা সফল প্রশাসক শেখ মুজিব আলোচিত হন, সমালোচিত হন, কিন্তু ব্যক্তি মুজিব খুব কমই প্রকাশ্য আলোচনায় এসেছেন। অথচ ব্যক্তি মুজিব, আমাদের ‘মুজিব ভাই’ এবং জনগণের ‘শ্যাখ সাব’!
আমার মতে, বঙ্গবন্ধু বা জাতির পিতা অথবা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি নয়, ‘মুজিব ভাই,’ যাঁকে আমরা অনেকে শুধু ‘নেতা’ বলে সম্বোধন করতাম, তিনি ভিন্ন পরিমাপে আলোচিত হতে পারেন। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় আমি ব্যক্তিটিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে বলেই তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন লিখেছি।
অনেক সময় দেখেছি, প্রয়াত মহান ব্যক্তিদের সম্পর্কে আলোচনায় ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে তাঁর কর্মপরিধি নিয়ে বেশি করে বক্তব্য দেওয়া হয়। অথচ ব্যক্তিগত গুণের কারণেই আমাদের দেশে নেতারা মহত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, সাধারণ মানুষের বুকে স্থান পেয়েছেন।
এ কথা আমাকে বলতে হবে না, তাঁকে যাঁরা জানতেন, চিনতেন, তাঁদের সবাই বলেন, শেখ মুজিবের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল, তাঁর বিরাট হৃদয়। কেউ কেউ বলেন, বিশেষ করে তাঁর সমসাময়িক কোনো কোনো রাজনীতিবিদ বলতেন, ‘শেখের মাথায় কিছু নেই, মুখের জোরে রাজনীতি করে গেল। জনগণের আবেগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন’—এসব ঢালাও মন্তব্যের জবাবে বলতে হয়, এ দেশে নেতা হওয়ার জন্য একটিমাত্র বস্তুই অতীব প্রয়োজনীয়। তা হচ্ছে হৃদয়। বিরাট একটি হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে। সর্বোপরি প্রয়োজন ক্যারিশমা, জনগণকে কাছে টানার, উদ্বেলিত করার, বিশেষ আদর্শে নেশাগ্রস্ত করার চুম্বকশক্তি অথবা জাদু। এ জন্য একটি বড়সড় ওজনদার কলিজা থাকতে হবে। শেখ মুজিবের তা ছিল।
শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, সি আর দাশ, মওলানা ভাসানীর অন্য গুণ থাকুক বা না থাকুক, সেটা ভিন্ন নিরিখে বিচার করতে হবে। তাঁদের ছিল বিরাট কলিজা, যাকে বলে দরাজ দিল। তাই ব্যক্তি মুজিবের আলোচনায় তাঁর বিরাট কলিজা তথা বিশাল হৃদয়ের কথাই বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নানাভাবে বিভিন্ন প্রসঙ্গে বলতে হবে বৈকি।
শেখ মুজিবের চরিত্রের সবচেয়ে দুর্বল দিকই ছিল এই নরম কলিজা। অনেকে বলেন, শেখ মুজিব জনগণকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছেন, একটি জাতির জন্ম দিয়েছেন ঠিকই; কিন্তু প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন বলেই স্বাধীনতার পর নানা সমস্যা ও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল।
নিজের জনগণের জন্য দিলটি খুলে দিয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু সমাজটিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসিনক দক্ষতা, ক্ষমতা, ক্রূরতা ও কূটনৈতিক আচ্ছাদনের আড়ালে চাপা দিয়েছিলেন। এই বক্তব্য আমি বলব সঠিক ও বেঠিক, উভয় অর্থেই সত্য। আবার একই যুক্তিতে বলতে হয়, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে শেখ মুজিব ছাড়া অন্য আর কেউ পুনর্গঠিত করতে পারতেন না।