আজ ,

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকা চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ০৩:১০ অপরাহ্ণ
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকা চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, অন্য কোনো বৈশ্বিক সংকটের আড়ালে রোহিঙ্গা ইস্যু যেন চাপা পড়ে না যায়।

আজ রবিবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ মিলনায়তনে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কোঅপারেশন ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফ্রেমিং রেসপনসিবিলিটিজ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেছেন, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আলোচনায় এ সংকটকে সবসময় সক্রিয় রাখতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, বিশ্ব রাজনীতির প্রভাবশালী দেশগুলো এবং জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ সহায়তায় রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য একটাই—আশ্রিত প্রায় ১৫ লাখ, ইউএনএইচসিআরের হিসাবে ১২ লাখ, বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহায়তা এবং প্রভাবশালী দেশগুলোর রাজনৈতিক ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।’

প্রায় নয় বছর ধরে বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, জমি ও জীবনধারণের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাম্পে অবস্থানের কারণে এখন সেখানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, মানবপাচার, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বাড়ছে।

এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে ক্যাম্পসংলগ্ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও পরিবেশও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পের চারপাশে সীমান্ত বেড়া নির্মাণ ও যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও সুনিয়ন্ত্রিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে অতীতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এবং ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কূটনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বর্তমান সরকারও সফল প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর্মুলেশন কমিটি অন রোহিঙ্গা অ্যাফেয়ার্স’ গঠন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক সমন্বয়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে আরেকটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটিও সক্রিয় রয়েছে। বেসামরিক প্রশাসন, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংস্থার সমন্বয়ে সরকার সর্বাত্মক সরকারি উদ্যোগে কাজ করছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা ছাড়া অনির্দিষ্টকালের মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমাধানের চাপ কমে যেতে পারে। তাই শুধু জরুরি ত্রাণ সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত ‘রূপান্তরকালীন কৌশল’ গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

আলোচনায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বক্তব্য দেন। তিনি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনিক সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আইজিসিএফের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আদনান রহমানের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে গোলটেবিল আলোচনা শুরু হয়। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী।

আলোচনায় বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি আইভো ফ্রেইসেন, বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রিদওয়ানুর রহমান, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শরণার্থী সেলের প্রধান ও যুগ্মসচিব মোহাম্মদ নাজমুল আবেদীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘাত অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাসসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।