সিলেটের সর্বমহলে পরিচিত এক নাম মাওলানা শফিকুল হক আমকুনী। গোলাপগঞ্জ থানার আমকুনা গ্রামে ১৯৪১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পর থেকেই সিলেট শহরের বাসিন্দা। তিনি ছিলেন সিলেটের বিত্তশালী আলেমদের একজন। শহরের প্রাণকেন্দ্র সোবহানিঘাট পয়েন্টে তিলেতিলে গড়ে তুলেছেন আজকের জামেয়া মাহমূদিয়া সোবহানিঘাট।
সদরে জমিয়ত হযরত শায়খে কৌড়িয়ার সাথে ছিলো তার আত্মার ও আস্থার সম্পর্ক। সিলেটে ফেদায়ে মিল্লাত হযরত আসআদ মাদানী রাহ.’র আগমনী ইস্তেকবালিয়া কমিটির তিনি ছিলেন মূল কনভেনার।
প্রায় ২০-২৫ বছর যাবত হযরত শায়খে কৌড়িয়ার কাঁদে কাঁদ মিলিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সিলেটের রাজনৈতিক সামাজিক অঙ্গনে অসামান্য অবদান রেখেছেন। সফরে হযরে বাসায় ও বাড়িতে বৈঠক ও সম্মেলনে দেশে-বিদেশে হযরত শায়খে কৌড়িয়ার একান্ত সচিবের ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। বিশেষত সিলেটের প্রাচীন শিক্ষাবোর্ড আযাদ দ্বীনী এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ এর কর্ম পরিচালনায় রয়েছে তার যথেষ্ট অবদান।
সিলেট জমিয়তের প্রতিষ্ঠাতা বাবায়ে জমিয়ত হযরত মাও. আশরাফ আলী বিশ্বনাথী রাহ. বিচক্ষণ রাজনীতিবীদ হযরত মাও. শফিকুল হক আকুনী ও তীক্ষè বোদ্ধা হযরত মাও. হোসাইন আহমদ বারকোটি রাহ.’র সহকর্মী হিসাবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের রাজনীতি করে গেছেন আজীবন। ফলে লোক সমাজে তিনি ইসলামী রাজনীতির এক মহান ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন।
সিলেটের প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের কাছে রয়েছে তার সমাদৃতি। শহরের বাসিন্দা ও সিলেট জমিয়তের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হোয়ার কারণে সিলেট মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ কাজে অন্যান্য নেতৃবৃন্দ তাকে মূল্যায়ন করতেন। তিনি ছিলেন সিটি মেয়র মরহুম বদর উদ্দীন কামরানের একান্ত কাছের লোক। সিলেটের সরকারী প্রশাসনকে ধমক ও হুমকির সুরে কথা বলার অধিকারী ৪ আলেমের মধ্যে তিনিও ছিলেন অন্যতম। ০১. মাও. নুরুল ইসলাম চতুলী রাহ. সিলেট সরকারী আলীয়া মাদরাসা, ০২. হযরত মাও. আব্দুল্লাহ শায়খে হরিপুরী রাহ., ০৩. প্রিন্সিপাল মাও. হাবিবুর রহমান রাহ., ০৪. হযরত মাও. শফিকুল হক আমকুনী রাহ.।
জমিয়তের রাজনীতি ও মাওলানা আমকুনী রাহ.: আনুমানিক ১৯৭৬ সাল থেকেই তিনি জমিয়তের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। তখন সবেমাত্র স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জমিয়ত গঠিত হয়েছে। ১৯৭৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মধ্যখানের সব ক’টি কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে যোগদান করে কেন্দ্রীয় কমিটির একজন প্রভাবশালী নেতা হিসাবে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এ সময়গুলোতে অনুষ্ঠিত জমিয়তের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় ও সিলেটের প্রায় সকল রাজনৈতিক প্রোগ্রামে তার অংশিদারিত্ব রয়েছে। জমিয়তের দীর্ঘসময়ের সাধারণ সম্পাদক মাও. শামসুদ্দীন কাসেমীর সাথে ছিলো তার অগাধ সম্পর্ক। মাও. মুফতি ওয়াক্কাস সাহেব তাকে মুরব্বি হিসাবে শ্রদ্ধা করতেন। দাউদ হায়দার, সরদার আলা উদ্দীন, দি সেটানিক ভার্সেস, মুরতাদ আলী আসগর ও তাসলিমা নাসরীন বিরোধী আন্দোলনে জমিয়তের কর্মসূচী বাস্তবায়নে সিলেটের অন্যান্য রাজনীতিবিদদের মতো তার অগ্রণী ভূমিকার কথা সর্বমহলে জ্ঞাত।
তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমিয়তের একমাত্র প্রার্থী মাওলানা আমকুনী: কোনো রাজনৈতিক দল সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারলে দলের গ্রহণযোগ্যতা ও ভাবমূর্তি জনগণের কাছে নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি নিবন্ধনও হারাতে পারে। ক্ষমতাসীন (এরশাদ) জাতীয় পার্টি ১৯৮৬ সালের ৭ই মে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। বি. এনপির নেতৃত্বাধীন দলসমূহ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে। এমতাবস্থায় সমগ্র দেশে একটি আসনেও প্রতিদ্বন্ধিতা করার জন্য যখন জমিয়তের কোনো প্রার্থী খোজে পাওয়া যাচ্ছিলোনা। এদিকে সদরে জমিয়ত হযরত শায়খে কৌড়িয়া, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী বাবায়ে জমিয়ত মাওলানা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী পেরেশান। দলের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। সেই কঠিন মুহুর্তে দল রক্ষার খাতিরে এগিয়ে আসেন সিলেটের জমিয়ত নেতা মাওলানা শফিকুল হক আমকুনী।
তিনি সিলেট ০৬ গোলাপগঞ্জ-বিয়নীবাজার আসনে দোয়াত কলম প্রতীকে নির্বাচন করেন। অনেক চেষ্টার পরও খেজুরগাছ প্রতীকের বরাদ্দ পাওয়া সম্ভব হয়নি। জমিয়তের পক্ষে নির্বাচনী জনসভা সমূহে হযরত মাওলানা আশরাফ আলী বিশ্বনাথী, হযরত মাওলানা হোসাইন আহমদ বারকোটি, হযরত মাওলানা নুরুল ইসলাম আহমদাবাদী, হযরত মাওলানা জিয়া উদ্দীন কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমীসহ সদরে জমিয়ত শায়খে কৌড়িয়া স্বশরিরে অংশগ্রহণ করে নির্বাচনী প্রচারণা অব্যাহত রাখেন।
কালো টাকার ছাড়াছড়ির এই নির্বাচনে আমকুনী রাহ. যদিও জয়লাভ করতে পারেননি। কিন্তু দেশের একটি জাতীয় নির্বাচনে একমাত্র দলীয় প্রার্থী হিসাবে তার সাহসিকতা ও আন্তরিকতাপূর্ণ এই ভূমিকা সত্যিই দলের প্রতি দরদমাখা ভালোবাসা ও প্রেমের প্রমাণ বহন করে। তিনি এই ঝুকি না নিলে হয়তো বা পরবর্তিতে সংসদীয় রাজনীতিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম দলটির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হতো। তাই হযরত মাওলানা শফিকুল হক আমকুনীর এই অবদান জমিয়তের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রকাশ করা আবশ্যক যে, এই নির্বাচনে জমিয়তের মাওলানা মুফতি ওয়াক্কাস সাহেব যদিও নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি জমিয়তের প্রার্থী হিসাবে নয়। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে বাসগাড়ী প্রতীকে নির্বাচন করেন এবং পরবর্তিতে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করে এরশাদ সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদালাভ করেন।
সিলেট জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত: ১৯৮৮ সালের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে আমকুনী রাহ. কে জমিয়তের কেন্দ্রীয় সহ সম্পাদক মনোনীত করা হয়। ১৯৮৯ সালে সিলেট জেলা জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক মাও. নুরুল ইসলাম আহমদাবাদী অব্যাহতি নিলে তাকে সিলেট জেলা জমিয়তের মজলিসে শুরার এক মিটিংয়ে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়। ফলে এই সময়টাতে সিলেটে জমিয়তের কাজে নতুনভাবে প্রাণ ফিরে আসে। আমি তখন জামেয়া মাহমূদিয়া সোবহানিঘাটের শিক্ষক। আমিও তখন আমকুনী রাহ. এর আমলে সর্বপ্রথম সিলেট জেলা কমিটির সদস্য মনোনীত হই। তখন সিলেট জমিয়তের সভাপতি ছিলেন হযরত মাও. শফিকুল হক আকুনী রাহ.।
সোবহানিঘাট ছিলো জমিয়তের মারকায: সিলেটে জমিয়তের রীতিমত কোনো অফিস ছিলোনা। তাই আমকুনী হুজুরের মাদরাসাই জমিয়তের অফিস হিসাবে ব্যবহৃত হতো। এমনকি আযাদ দ্বীনী এদারার মিটিংও অনুষ্ঠিত হতো সোবহানিঘাট জামে মসজিদে। জমিয়তের মিটিং, এদারার মিটিং, ফেদায়ে মিল্লাতের সফরনামা তৈরির মিটিং, ঢাকা ও সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত জমিয়ত নেতৃবৃন্দের আগমন ও বিরতি সোবহানিঘাট। ইত্যাদি সব মিলিয়ে জামেয়া মাহমূদিয়া সোবহানিঘাট তখন সিলেটের উলামায়ে কেরামের মরকায হিসাবে পরিগণিত হতে লাগলো। এমনকি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রধান দফ্তর ঢাকা মিরপুরস্ত মাওলানা শামস্দ্দুীন কাসেমীর আরজাবাদ মাদরাসা থাকলেও সিলেটের সোবহানিঘাটের আমকুনির মাদরাসা ২নং কেন্দ্রীয় দফতর হিসাবে বিবেচিত হতে লাগলো। আমকুনী হুজুর ছিলেন বিত্ত ও চিত্ত উভয়টার অধিকারী। তাই সোবহানিঘাট মরকাযে কেন্দ্র থেকে এবং সিলেটের তৃণমোল থেকে আগমনকারী জমিয়তের সকল নেতা কর্মীর মেহমানদারির ইন্তেযাম থাকতো। জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতির বাড়ি সিলেটে। তাই ঢাকা থেকে আগত মেহমানরা সদরের সাথে সাক্ষাৎ পরবর্তী সময় কাটাতেন সোবহানিঘাট মরকাযে। আর আমকুনী হুজুরও উদারমনে তার বিত্তকে খুলে দিতেন সকলের তরে।
রাজনৈতিক তৎপরতা: ১৫-০৯-১৯৮৯ তারিখে সদরে জমিয়ত হযরত শায়খে কৌড়িয়া রাহ.’র সভাপতিত্বে ও জেলা ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হযরত মাও. আমকুনীর পরিচালনায় জেলা জমিয়তের এক গুরুত্বপূর্ণ মজলিসে শুরার অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় জামেয়া মাহমূদিয়া মাদরাসা মসজিদের দ্বিতলা ভবনে। গুরুত্বপূর্ণ এই সভায় ২৬ জন শুরা সদস্য উপস্থিত হোন। তন্মধ্যে অন্যতম কয়েকজন ০১. মাও. আইয়ূব, খরিলহাট, ০২. মাও. আহমদ হোসাইন আতহারী, চতুল ঈদগাহ, ০৩. মাও. উবায়দুল্লাহ ফারুক আকুনী, ০৪. মাও. জিয়া উদ্দীন আঙ্গুরা, ০৫. মাও. হোসাইন আহমদ বারকোটি, ০৬. মাও. শফিকুল হক আকুনী, ০৭. মাও. জাকারিয়া মাশুক, গোলাপগঞ্জ, ০৮. মাও. শিহাব উদ্দীন চতুলী রেঙ্গা, ০৯. মাষ্টার সোলাইমান আহমদ সিলেট শহর, ১০. মাও. নুর উদ্দীন আহমদ গহরপুরী, ১১. মাও. মাহতাব উদ্দীন বারকোট, ১২. মাও. মনছুরুল হাছান রায়পুরী, ১৩. মাও. মুহাম্মদ কানাইঘাট, ১৪. মাও. আব্দুল মালিক, লাফনাউট, ১৫. মাও. আব্দুল খালিক চাক্তা। সিলেটের বুজুর্গানে দ্বীনের সাথে জমিয়তের দাওয়াত ও মতবিনিময় করার জন্য হযরত মাও. নুর উদ্দীন গহরপুরীর নেতৃত্বে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি সাব কমিটি গঠন করা হয়। অপর এক প্রস্তাবে সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাও. নুরুল ইসলাম আহমদাবাদীর অব্যাহতি মঞ্জুর করত মাও. শফিকুল হক আমকুনীকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়। তৃতীয় প্রস্তাবে সিলেট জেলার প্রতিটি উপজেলা কমিটি গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়।
হযরতের স্বতন্ত্র কয়েকটি গুণ: শিক্ষা, রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকা-ে অবদান রাখার পাশাপাশি মাওলানার মধ্যে স্বতন্ত্র কয়েকটি গুণ বিদ্যমান ছিলো; যা সচরাচর সবজায়গায় পাওয়া যায়না।
০১. তাকবীরে উলা ও জামাআতের সঙ্গে নামায আদায় করা ছিলো তাঁর আমলী জিন্দেগীর বৈশিষ্ট্য।
০২. নিজের পরিবার-পরিজনের মধ্যে শরয়ী পর্দা প্রতিষ্ঠা করা ছিলো তাঁর পারিবারিক জীবনের এক অনুপম কীর্তি।
০৩. প্রতিকুল পরিবেশেও সৎসাহসে কথা বলা ছিলো তাঁর সামাজিক জীবনের বৈশিষ্ট্য।
০৪. মাহফিল পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণসহ মাহফিলে প্রভাব ফেলে দেয়া ছিলো রাজনৈতিক জীবনের বৈশিষ্ট্য।
০৫. যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া-দেয়ার ক্ষমতা ও স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহসী উচ্চারণ ছিলো তাঁর মেধা ও মননের অনুপম বৈশিষ্ট্য। ০৬. শত্রু কিংবা প্রতিপক্ষকে ক্ষমা করে দিয়ে আপন করে নেয়া ছিলো তার আখলাকী জিন্দেগীর বৈশিষ্ট্য।
অবশেষে জমিয়তের এই তীক্ষè ও বোদ্ধা রাজনীতিক ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল হাজার হাজার ছাত্র-শীষ্য, ভক্তকুলকে শোকসাগরে ভাসিয়ে পরলোক গমণ করেন। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের উচুঁ মাকাম দান করুন।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম, জামেয়া আয়েশা সিদ্দিকা বালিকা মাদরাসা, মেজরটিলা, সিলেট।