আজ ,

পশম পশম রিওয়র্ড চুল চুল অ্যাওয়ার্ড

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত জুলাই ৮, ২০২২, ০১:০৭ পূর্বাহ্ণ
পশম পশম রিওয়র্ড চুল চুল অ্যাওয়ার্ড

একটি সাধারণ উটের সারা দেহে কতটি চুল থাকতে পারে। কেউ কখনো গুনে দেখেছে কি না, এ যাবত কাল তা শুনিনি,তবে আশু দিনে হয়ত কোন মেশিন কাউন্ট করে দিবে।

একটি উট বছরে হয়ত প্রায় পাঁচ পাউন্ড (২.২৫ কেজি) চুল উৎপাদন করতে পারে, সে হিসাব আছে কিন্তু আমাদের দরকার সংখ্যা।উটের শরীরে পশম কত?

মঙ্গোলিয়া, তিব্বত, আফগানিস্তান, ইরান, রাশিয়া, চীন, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া,এ সব দেশ উটের চুলের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। এরা কেউ উটের চুলের সংখ্যা র্নিণয় করে থাকতে পারে তবে এর কোন তথ্য আমার জানা নেই।

গরু ছাড়া পৃথিবীর কথা কল্পনা করা যায়না।গরু গৃহপালিত প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত প্রাণী।সেই তখন,যখন সভ্যতার ছোঁয়া পায়নি পৃথিবী,গরু তখনো ছিল অতি প্রয়োজনীয় প্রাণী।আজো গরুর অপরিহার্যতা শেষ হয়নি। বিশ্বময় প্রায় ১৩০ কোটি গরু রয়েছে।

এ ছিল ২০১১ সালের অনুমান অনুযায়ী।বর্তমানে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন গরু আছে।কিন্তু কথা হল, একটি গরুতে কতটি চুল আছে। এনি আইডিয়া?

প্রায় ৩০০ প্রজাতিরও বেশি ছাগল রয়েছে এ দুনিয়ায়।গৃহপালিত প্রাচীনতম প্রাণী ছাগল। ছাগল আর ভেড়া প্রায় এক বিলিয়ন আছে পৃথিবীর বুকে। কিন্তু আমি জানতে চাই, একটি ছাগল অথবা একটি ভেড়ায় কতটি পশম রয়েছে।

এসব পশুর পশমের সংখ্যা আমার প্রয়োজন এ কারণে যে,পরকালের সাথে এক লাভজনক বিজনেস জড়িয়ে আছে এসব জন্তুর চুলের সংখ্যার সাথে। এ পশুগুলোর পশমের গণনার অনুপাতে আখিরাতের প্রচুর কারেন্সি বা সাওয়াব উপার্জনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

ক্বিয়ামতের দিন একটি মাত্র সাওয়াবের অভাবে,আমার প্রভূত ক্ষতি হয়ে যেতে পারে আবার একটি মাত্র অতিরিক্ত সাওয়াবের জন্য আমি বেঁচে যেতে পারি সমূহ অনিষ্ট থেকে।

তাই আমাকে আজীবন সাওয়াবের সন্ধানে লেগে থাকতে হবে।প্রয়োজনে আমাকে পশুর দেহ থেকে সাওয়াব কুড়িয়ে আনতে হবে।জন্তুর চুল যদি আমাকে জান্নাতের একটু সুখ পাইয়ে দিতে পারে,আমি কেন বিমুখ হবো।

দয়াময় স্রষ্টার দয়ায় কোন কার্পণ্য নেই।তিনি,উদার ও মুক্ত রেখেছেন বান্দাদের জন্য তাঁর সুযোগ-সুবিধার বিশাল কুদরতি আয়োজন।তাঁর রাহমানী নীতি হচ্ছে—বান্দাদেরে অবকাশ না দিলে তারা কোথা থেকে অর্জন করবে।বিশেষ করে,শেষ বেলার সুকুমার উম্মতকে বিকাশের সুযোগ না দিলে তো তারা হাশরের মার্কেটে দর-কষাকষিতে অন্যান্য গ্রাহক (উম্মাত) থেকে পিছিয়ে পড়বে।

আর বান্দারা বৈচিত্র্য ভাল পায়।এমনকি বন্দেগীতেও বিচিত্র তাদের প্রিয়।সারা বছর একই ধরণের ইবাদাতে লিপ্ত থাকলে বান্দাদের উৎসাহ,উদ্দীপনায় যে কমতি দেখা দিবে,স্রষ্টা এসব ভালই বুঝেন,ভালই জানেন।তাই,বৈচিত্র্যের স্রষ্টা,তাঁর মনোনীত ধর্মের উপাসনাকেও বৈচিত্র্য দিয়ে সাজিয়েছেন।একারণে দিন-রাত তথা প্রতি দিনের উপাসনা,সাপ্তাহিক অর্চনা এবং বাৎসরিক আরাধনার রূপরেখায় তিনি রেখেছেন নতুনত্ব এবং অভিনবত্ব।

আবার দুহাতে পরকালীন-মুদ্রা তথা সাওয়াব যাতে বান্দাগণ কামাই করতে পারে,সেজন্য যেমন রেখেছেন প্রাত্যহিক স্বাভাবিক ইবাদাহ তেমনি মৌসুমি এবং বিবিধ সময়কে কেন্দ্র করে পূণ্য অর্জনের বহুবিধ সুব্যবস্থার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছেন।কারণ,মুসলিম জিন্দগিই এমন যেখানে চিরন্তন পরকালকীন জীবনকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

চাঁদ বর্ষের শেষ মাস ‘যুল-হিজ্জাহ’।৩৮০০ বছর আগে,এ মাসেই ঘটে যায় বাপ-ছেলে খ্যাত দুজন প্রথিতযশা ‘রাসূলদের’ ঈর্ষণীয় আদর্শ কান্ড।আর এই অনুকরণীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করেই সাওয়াব উপার্জনের আবহ তৈরি হয়ে যায়।পরিশেষে এই মোক্ষম সুযোগের সদ্ব্যবহার করা থেকে বঞ্চিত করা হয়নি পরবর্তী প্রজন্মকে।

উপভোগে নয় বরং পরিত্যাগে,ভোগে নয় বরং ত্যাগেই অর্জিত হবে কল্যাণ।দশম যুল-হিজ্জাহ-তে এসব নজির লালিত হয়ে পালিত হলেও আরো বহু অর্জন আছে এ দিনটি ঘিরে।

উপরের নিবন্ধটির মোটকথা একটি হাদীসে বিবৃত হয়েছে।কিন্তু,হাদীসটি terminologically দুর্বল।হাদীসটির বর্ণনা পরম্পরায় দুজন ব্যক্তি নিয়ে কথা আছে।তবে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে আশা জাগানিয়া এই হাদীস,মুসনাদু আহমাদ(১৮৮৫৭),আল-মসতাদরাক(৩৩৯৫,এবং আল-হাকিম রাহিমাহুল্লাহর মন্তব্য: هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الإِسْنَادِ وَلَمْ يُخْرِجَاهُ ),ইবনু মাজাহ(৩১২৬) সহ অপরাপর হাদীস গ্রন্থ এবং তাফসীর ইবন-কাছীর সহ অন্যান্য স্বনামধন্য কিতাব দ্বারা প্রচারিত।

সাহাবী যায়েদ ইবন আরক্বাম রাদ্বিআল্লাহু আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহাবা জিজ্ঞেস করলেন,ইয়া রাসূলাল্লাহ! আদ্বাহী (কোরবানি) কী? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বল্লেন, “আদ্বাহী হলো তোমাদের পিতা ইবরাহিম আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত (ঐতিহ্য)।”
সাহাবা প্রশ্ন করলেন,হে আল্লাহর রাসূল! এতে আমাদের জন্য কী রয়েছে?
তিনি জবাব দিয়ে বল্লেন, “পশুর প্রতিটি পশমের পরিবর্তে একটি করে সওয়াব রয়েছে।” তারা পুনরায় লোমশ পশুর পশম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন।তিনি জানালেন যে, “রোমশ জন্তুর প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি করে নেকী রয়েছে।
নিচে যোগ করছি মূল আরবি হাদীস:

عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ، قَالَ قَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا هَذِهِ الأَضَاحِيُّ
قَالَ “ سُنَّةُ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا فَمَا لَنَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ بِكُلِّ شَعَرَةٍ حَسَنَةٌ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا فَالصُّوفُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ ‏”‏ بِكُلِّ شَعَرَةٍ مِنَ الصُّوفِ حَسَنَةٌ ‏”‏‏.‏

কথোপকথনমূলক আলোচিত হাদীসটি প্রমাণ করে যে,ঈদুল আদ্বহা এবং তার পরের তিনদিন সময়ে কুরবানী কৃত পশুর পশমে পশমে পূণ্য আর চুলে চুলে সাওয়াবের সম্পদ নিহিত আছে।তবে এ জন্য আমাকে পশুর পশম আদৌ গুনতে হবে না বরং হাদীসটির মর্ম হচ্ছে একটি পশু থেকে অজস্র ও অসংখ্য নেকী অর্জন করা যেতে পারে আর হৃষ্টপুষ্ট অথবা বড় পশু হলে তো আরো বেশি পূণ্য লাভ করা যেতে পারে।কারণ তাদের শরীরে থাকে অগণিত লোম ও পশম।তাই এসব প্রামাণ্য থেকে আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য আমি পেয়ে গেছি।শোকরিয়া প্রিয় নবীর।

শুধু এই প্রামাণ্য নয় বরং অনেকগুলো আয়াত আর বহু হাদীস আমাকে প্রবুদ্ধ করছে ঐ সময়ের এই সর্বোৎকৃষ্ট শুভ-কর্মটি সম্পাদন করতে।আমি কৃতজ্ঞ স্রষ্টার কাছে—জান্নাতের সুখ তিনি,কত বিচিত্র ও কত সহজলভ্য ভাবে আমার কাছে উপস্থাপন করছেন।

এই সময়ে,কুরআনের এই (নিচের) যুগান্তকারী আয়াতগুলো যদি পাশে রাখি তবে তো আমাকে আরো উদ্দীপ্ত হতে হবে—
فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ
(২ নাম্বার সূরার ১৪৮ নাম্বার একাংশ)
অর্থ: কাজেই সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাও।

لِمِثْلِ هَٰذَا فَلْيَعْمَلِ الْعَامِلُونَ
(৩৭ নাম্বার সূরার ৬১ নাম্বার আয়াত)
অর্থ: এমন সাফল্যের জন্যে পরিশ্রমীদের পরিশ্রম করা উচিত।এবং—

وَفِي ذَٰلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ
(৮৩ নাম্বার সূরার ২৬ নাম্বার আয়াতের শেষাংশ)
অর্থ: এ(জান্নাত) বিষয়ে প্রতিযোগীদের প্রতিযোগিতা করা উচিত।

কুরআনের এইসব প্রস্তাবনা ও নির্দেশনা ছাড়াও নববী আদর্শে পাওয়া যাবে যে,তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল আদ্বহার আদেশ আসার পর থেকে মাদিনার পুরো দশটি বছর পশু কেটে আদ্বহা উদযাপন করেছেন।তিনি কুরবানির নির্দেশ দিতেন।তিনি কুরবানি-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খুব বিস্তারিত বলে গেছেন।সচ্ছল যারা উদ্বহিয়া করবে না তাদের প্রতি তিনি উষ্মা প্রকাশ করেছেন।তিনি ধনী নবী ছিলেন না।তারপরও তিনি উট,গরু ও ভেড়া—সবই উদ্বহিয়া করতেন।তিনি চিত্রবিচিত্র, শিংবিশিষ্ট, মোটাতাজা খাসি-ভেড়া আদ্বাহীতে দিতেন।তিনি তাঁর নিজের,তাঁর পরিবার এবং তাঁর উম্মাতের পক্ষ থেকে যাবাহ করতেন।তিনি সাধারণত প্রতিবছর দুটি ভেড়া যাবাহ করতেন।আর বিদায় হজ্জে তো তিনি ‘দম-শোকর’ হিসেবে ১০০টি উট নাহার (কুরবানি) করেছেন।

উটকে কাটা—নাহর আর অনন্য পশু কাটাকে যাবাহ বলে।ঐ সময় নবী নিজে ৭টি উট একাই নাহার করলেন।তারপর আরো ৬৩টি উট, আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহুর একটু সহযোগিতায় তিনি নাহার করলেন আর বাকিগুলো সাইয়্যিদুনা আলী নাহার করলেন।

এত বিপুল উটের বহর নাহর করে তিনি নিশ্চয় অপচয় করেননি।তিনি বরং তাতে উত্তম আদর্শ রেখে গেছেন।তিনি সত্যিই পথ-প্রদর্শক।

সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।