আজ ,

নগর এক্সপ্রেসের নথি নেই নগর ভবনে

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫, ০২:২৭ অপরাহ্ণ
নগর এক্সপ্রেসের নথি নেই নগর ভবনে
  • মূল রিপোর্ট: দৈনিক সিলেটের মানচিত্র

সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। তারপরও বাসের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নগর এক্সপ্রেস’। সিটি করপোরেশনের নাম ভাঙিয়ে ৭ বছর ধরে চলছে নগর এক্সপ্রেস’র প্রতারণা। অথচ এই গণ পরিবহনটির সঙ্গে নগর ভবনের কোনো সম্পর্ক নেই। তারপরও নগরীর বিভিন্ন সড়কে বাসটি সিটি করপোরেশনের নাম ও লোগো লাগিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এই বাসের আয়ের একটি বিশাল অংশ হাতিয়ে নিচ্ছেন কিছু ব্যক্তি মালিক সুবিধাভোগীরা। তারা বাসের গায়ে সিটি মালিক গ্রুপ তকমা লাগিয়ে প্রতারণা করছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। 

অভিযোগ রয়েছে, নগর এক্সপ্রেস বাসটি শুধু সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গে প্রতারণা করছে না, তারা করপোরেশনের নামে ক্ষমতার প্রভাবও খাটাচ্ছেন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঐতিহ্যবাহী ক্বিনব্রীজের নিচে পর্যটন এলাকা আলী আমজদের ঘড়ি ঘরের আশপাশে বাসগুলো অবৈধভাবে পার্কিং করে রাখা হয়েছে। তাছাড়াও সিসিকের বিকল্প পরিবহন ভবনের নিচতলার একটি কক্ষ নগর এক্সপ্রেসের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু সিটি করপোরেশন নগর এক্সপ্রেস থেকে ব্যবহৃত কার্যালয়ের কোনো ভাড়া পাচ্ছে না বলে জানান সিসিক কর্তৃপক্ষ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর সকালে সিলেট নগরীতে ‘নগর এক্সপ্রেস’ নামের গণপরিবহনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন। বাসটি চালু হয়েছিল নগরীর গণপরিবহন সংকট নিরসনের জন্য। যদিও পরবর্তীতে এর সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বাসটির সার্ভিস খারাপ, ভিতরের নোংরা পরিবেশ ও ভাঙাচোরা অবস্থা নগরবাসীর পরিবহন সমস্যার সমাধানে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে তাদের সেবা এতই খারাপ যে, সড়ক থেকে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে এ গণপরিবহন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগর এক্সপ্রেস বাসের সিটি বাস মালিক গ্রুপের প্রথম আহ্বায়ক ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মখলিছুর রহমান কামরান। ৫ আগস্টের পর  মামলার আসামি হওয়ায় তিনি এখন আত্মগোপনে আছেন। বর্তমানে নগর এক্সপ্রেস সিটি বাস সার্ভিসের পরিচালকের দায়িত্বে আছেন সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-এর সাবেক পরিচালক খন্দকার কাউসার আহমেদ চৌধুরী রবি। এছাড়াও বাসটির মালিক গ্রুপে যুক্ত আছেন সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মাহবুবুল হক চৌধুরী। বাসটির প্রতিদিনের আয়ের হিসাব নিচ্ছেন এনাম ও আজাদ নামের দু’জন ব্যক্তি। তারা সিলেট সিটি করপোরেশনের পরিবহন শাখার নিচতলার ডান দিকের একটি কক্ষে বসেন। এখান থেকেই বাসটির আর্থিক হিসাব-নিকাশ পরিচালনা করা হচ্ছে।

সরেজমিনে নগর ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর ক্বিনব্রীজের নিচে ঐতিহ্যবাহী আলী আমজাদের ঘড়ির পাশের ওয়াকওয়ের সামনে এলোমেলো করে রাখা কয়েকটি বাস। প্রত্যেকটি বাসের পায়ে সিটি করপোরেশনের নাম ও লগো দেওয়া। যদিও আলমপুরে নিজস্ব টার্মিনাল রয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন এসব বাস সুরমা নদীর তীরের ওয়াকওয়েতে অবৈধ পার্কিং করে রাখা হয়। বাসগুলোর গায়ে সিটি করপোরেশনের মনোগ্রাম থাকায় সাধারণ যাত্রী দেখলে হয়তো ভেবে নিবেন বাসগুলোর মালিক সিলেট সিটি করপোরেশন।

অথচ নগর এক্সপ্রেস পরিচালনা করছেন কয়েকজন পরিবহন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ। এছাড়া বাসের গায়ে পরিচালনায় সিলেট সিটি করপোরেশন, সিটি বাস মালিক গ্রুপ-ইত্যাদি লেখা রয়েছে। নারীদের জন্য একটি বাস থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে নারীদের জন্য কোনো বাসের দেখা মিলে নি।

বাসের ভিতরে প্রবেশ করে দেখা যায় ভেতরের পরিবেশ নোংরা। সার্ভিস উন্নত করার কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়নি। বিভিন্ন স্থানে বাসের চাকা নষ্ট হয়ে রাস্তার ওপর মেরামতের বরং দৃশ্যও দেখা যায়।
টুকেরবাজারের এনজিও প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী রুস্তুম আলী বলেন, নগর এক্সপ্রেসের বাসটি আগে টুকেরবাজার রুটে চলতো। এখন বাসটি আগের মতো দেখা যায় না।’

হেতিমগঞ্জ রুটের যাত্রী সাংবাদিক জাকারিয়া তালুকদার বলেন, বাসটি আগে ভালো ছিল, এখন তো সড়কে দেখি না। কদমতলী থেকে যাওয়া-আসা করতাম, এখন তাদের বাস কমে গেছে।’

সিসিকের একটি সূত্র জানায়, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সহায়তায় ৪১টি বাস নিয়ে যাত্রা শুরু করে গণপরিবহন নগর এক্সপ্রেস। নগর এক্সপ্রেসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। সিসিকের কয়েকজন কাউন্সিলর বাসের শেয়ার কিনেছিলেন। যদিও ৪১টি বাস নিয়ে যাত্রা করেছিল নগর এক্সপ্রেস, কিন্তু বর্তমানে ২১টি বাস নগরীর বিভিন্ন রুটে চলছে। তা-ও ভাঙাচোরা, রঙচং উঠে যাওয়া বডি নিয়ে নগর ঘুরছে নগর এক্সপ্রেস। নগর এক্সপ্রেসের সঙ্গে নগর ভবনের সম্পর্ক খুঁজতে গেলে সেখানে এ বাসের কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি।

সিসিকের পরিবহন শাখা জানায়, নগর ভবনের নিজস্ব সকল গাড়ি সংরক্ষণ ও মেরামতের দায়িত্ব পালন করছে শাখাটি। নতুন গাড়ি যুক্ত, পুরনো গাড়ি মেরামত-সবই পরিবহন শাখা থেকে পরিচালনা করা হয়। কিন্তু সিসিকের এ পরিবহন শাখার সঙ্গে নগর এক্সপ্রেস বাসের কোনো সম্পর্ক নেই। বাসগুলো ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। এ বাসগুলোর ভাড়ার টাকা ব্যক্তি মালিকের পকেটে যাচ্ছে। এ টাকার হিসাব সিসিকের কারো জানা নেই। কিন্তু সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিসিকের পরিবহন শাখার একটি কক্ষ তাদেরকে কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দেন। এটি নিয়ে সিসিক’র অনেক কর্মকর্তা বিব্রতকর।

নগর এক্সপ্রেসের সূত্র জানায়, এই বাসগুলো টুকেরবাজার থেকে মেডিকেল রোড হয়ে হেতিমগঞ্জ যাচ্ছে। টুকেরবাজার থেকে বন্দর টু বটেশ্বর, সুরমা মার্কেট পয়েন্ট থেকে হেতিমগঞ্জ ও এয়ারপোর্ট থেকে কদমতলী হয়ে মোগলাবাজারের হাজীগঞ্জে যাচ্ছে।

নগর এক্সপ্রেসের ম্যানেজার আজাদ রেজা চৌধুরী ও এনাম আহমদ জানান, তারা কিছুই জানেন না। বাসগুলো এখন পরিচালনা করছেন খন্দকার কাউসার আহমেদ রবি ও ভিপি মাহবুবুল হক চৌধুরী। পরিবহন শাখার কক্ষের ভাড়া দেন কি না-প্রশ্নের জবাব তারা দুজনের কেউ-ই দিতে পারেননি। তারা আরও জানান, তাদের ব্যবসা বর্তমানে লোকসান গুণছে।  ভর্তুকি দিয়ে চালানো হচ্ছে। ইনকামের চেয়ে মেরামত খরচ বেশি হচ্ছে।

সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মাহবুবুল হক চৌধুরী বলেন, নগর এক্সপ্রেস বর্তমানে পরিচালনা করছেন রবি, আমার একটা বাস আছে। এছাড়া নগর এক্সপ্রেসের সঙ্গে আমার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর এক্সপ্রেস সিটি বাস সার্ভিসের পরিচালক ও সিলেট চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক খন্দকার কাউসার আহমেদ চৌধুরী রবি বলেন, বাসগুলো চালুর জন্য সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী প্রজেক্টের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এটা মূলত, ব্যক্তি মালিকানাধীন বাস, এটার সঙ্গে সিটি করপোরেশনের কোনো মালিকানার সম্পর্ক নেই। লস প্রজেক্ট হিসেবে আছে। সিটি করপোরেশনের লোগো থাকলে মুছে ফেলা হবে।’

সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন,‘ নগর এক্সপ্রেসের গণপরিবহনটির সঙ্গে আমাদের সিলেট সিটি করপোরেশনের কোনো সম্পর্ক নেই। কেনো পরিবহন শাখায় কার্যালয় দেওয়া হলো, তা জানি না। এখানে শুধু সিসিকের গাড়ি মেরামত করা হয়, নগর এক্সপ্রেসের কোনো গাড়ি আমরা মেরামত করি না। পরিবহন শাখার রুমের কোনো ভাড়া সিসিককে দেওয়া হয় না।’

সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার বলেন, নগর এক্সপ্রেস’র সঙ্গে সিসিকের কোনো চুক্তি বা সম্পর্ক নেই। এটা তৎকালীন সময়ে কিছু ব্যক্তি মালিকেরা চালু করেছিলেন। বাসটিতে নগর এক্সপ্রেস লেখা হলেও নগর ভবন এ বাসের মালিক নয়। বাসটি থেকে নগর ভবন কোনো ভাড়া পায় না।

জানতে চাইলে সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ওই সময়ে নরগবাসীর পরিবহন সমস্যা দূর করতে আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছিলাম। বাসটি যেহেতু নগরে চলবে, সেহেতু তারা নগর এক্সপ্রেস নাম দিয়েছে। এটার সঙ্গে সিলেট সিটি করপোরেশনের সম্পর্ক নেই। সিসিকের নাম বা লোগো ব্যবহার করা ঠিক হয়নি।