আজ শুক্রবার, ১২ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কোতোয়ালির এসি সোহেলের ‘প্রতারণা’ বিয়ে, তবুও বহাল দায়িত্বে

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত জুন ১১, ২০২৬, ১০:২০ অপরাহ্ণ
কোতোয়ালির এসি সোহেলের ‘প্রতারণা’ বিয়ে, তবুও বহাল দায়িত্বে

মূল রিপোর্ট: দৈনিক সিলেটের ডাক: এ যেন শর্ষের মধ্যে ভুত। সাধারণ মানুষ প্রতারিত হলে পুলিশের কাছে ছুটে যান। ছুটে যান জীবন বাঁচাতে।

কিন্তু, এএসপি সমপর্যায়ের কর্মকর্তা যদি প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? সিলেটে কর্মরত এক পুলিশ কর্মকর্তা তারই সহকর্মী বিসিএস ক্যাডার নারীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে-বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

খোদ পুলিশের একাধিক তদন্তে এর প্রমাণও মিলেছে। গুণধর এই পুলিশ কর্মকর্তার নাম সোহেল উদ্দিন প্রিন্স। যিনি বর্তমানে সিলেট মহানগর পুলিশ এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) দায়িত্বে রয়েছেন। প্রতারণার এমন ঘটনায় অবশেষে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা সোহেল উদ্দিন প্রিন্সের বিচার কার্যক্রম শুরু করেছেন আদালত।

ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক নাজমিন আক্তার ইভা আসামি সোহেল উদ্দিন প্রিন্সের উপস্থিতিতে দন্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু করেন। দন্ডবিধি আইনে বিচার কার্যক্রম শুরু হলেও তিনি এখনও স্বপদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী মুসলেহ উদ্দিন জসিম সিলেটের ডাককে এর সত্যতা নিশ্চিত করেন। গতকাল বুধবার বিকেলে এ বিষয়ে তিনি জানান, আসামি সোহেলের উপস্থিতিতে গত মঙ্গলবার মহানগর হাকিম আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

আদালত আগামী পহেলা জুলাই বুধবার মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য্য করেছেন। ওই দিন সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হবে। আসামি সোহেল উদ্দিনের বিরুদ্ধে ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে আরও বেশ কয়েকটি মামলা চলমান রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা আত্মসাৎ জানা গেছে, চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার মনতলা গ্রামের মৃত মো. হাবিব উল্লার পুত্র মো. সোহেল উদ্দিন প্রিন্স (৩৬) ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত ৩৬ তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন রাজধানী ঢাকার শাহজাহানপুর থানার মালিবাগের স্বপ্না বেগম (ছদ্মনাম)।

এর মধ্যে সোহেল উদ্দিন বাংলাদেশ পুলিশে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আর স্বপ্না বেগম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতাধীন সহকারী কর কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয়ের সুবাদে তাদের মধ্যে প্রথমে বন্ধুত্ব পরবর্তীতে তা প্রেমের সম্পর্ক গড়ায় । এক পর্যায়ে সোহেল স্বপ্নাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।

সোহেল চাঁদপুরের গ্রামের বাড়িতে স্বপ্নাকে নিয়ে যান। চার বছর এভাবে চলার পরে একসময় সোহেল স্বপ্নার বাসার পাশে মালিবাগ পাবনা কলোনির ২২২/৯ নং বাসায় ওঠেন। এরপর বিয়ের প্রস্তুতি হিসেবে ২০২১ সালের ১৯ জুলাই থেকে প্যানাসনিক এসি, হিটাচি ফ্রিজ, প্রোম্যাক্স আইফোন, র‌্যাডো ঘড়ি, স্বর্ণের আংটি, হোমটেক্স শোরুমের দামি পর্দাসহ ৮ লাখ ৮৬ হাজার ৪৪১ টাকার পণ্য ক্রয় করে সোহেলের বাসায় দেয়া হয়।

এরপর চাঁদপুরে জমি কেনার জন্যে ৩৩ লাখ টাকা, ট্রেনিং-এ যাবার সময়ে ৬৫ হাজার টাকা, পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-৩ এ জমি ক্রয়ের জন্যে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন সময় সোহেলের চাহিদা অনুযায়ী টাকা দেন স্বপ্না বেগম ও তার পরিবার। এক সময় ফ্ল্যাট কিনতে নগদ টাকার জন্য সোহেল চাপ দিলে স্বপ্না তার মায়ের ১৫৩ ভরি স্বর্ণ এনে দেন এবং এগুলো বিক্রি করে নগদ টাকা এনে দিলে সোহেল আর টাকা দেননি।

এভাবে স্বপ্না বেগম ও তার মায়ের নিকট থেকে নগদ, পণ্য সামগ্রী, ব্যাংকিং চ্যানেল, স্বর্ণ নেয়ার মাধ্যমে সর্বমোট ৩ কোটি ৬৩ লাখ ৮১ হাজার ১৬৭ টাকা গ্রহণ করেন। উক্ত টাকার মধ্যে ২০২১-২০২২ কর-বর্ষের রিটার্নে এএসপি সোহেল উদ্দিন প্রিন্স ২ কোটি ৬৩ লাখ ৮১ হাজার ১৬৭ টাকার তথ্য স্বীকার করেন।

সোহেল বাদীনিকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং তাঁর পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করে বিভিন্ন অজুহাতে ধাপে ধাপে ২ কোটি ৩২ লাখ ১১ হাজার টাকা হাতিয়ে নিলেও পরবর্তীতে তিনি আর স্বপ্নাকে বিয়ে করেননি এবং টাকাও ফেরত দেননি। বিপুল পরিমাণের অর্থ নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি সোহেল উদ্দিন। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহকারী কর কমিশনার স্বপ্নাকে জোরপূর্বক ধর্ষণও করে।

একসময় স্বপ্না জানতে পারেন, এএসপি সোহেল চাকরির আগে ২০১৪ সালে আমেনা কিবরিয়া মিশু নামের আরেকজনকে বিয়ে করেন। ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল রিফাত জাহান স্নিগ্ধা নামের আরেক তরুণীকে বিয়ে করেন। সোহেলের বাসায় গিয়ে স্বপ্না পুলিশের এক নারী উপ-পরিদর্শককে দেখতে পান। পরে এ নিয়ে সোহেল স্বপ্নাকে বেধড়ক মারধর করেন।

উপরোক্ত তথ্যসহ আরও বিস্তর বর্ননা দিয়ে স্বপ্না বেগম ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর একটি মামলা দায়ের করেন। সিআর মামলা নং- ২৩৪১/২০২২। তদন্তে মালামাল উদ্ধার ও ঘটনার প্রমাণ মামলার বাদী ভিকটিম স্বপ্না বেগম সিলেটের ডাককে জানান, মামলা দায়েরের পরে আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-কে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পিবিআই তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। আসামি সোহেলের বাসা থেকে স্বপ্না বেগমের দেয়া এসি, টেলিভিশন, মোবাইল, গিজার উদ্ধার করে আদালতে সোপর্দ করে। পরে আদালত থেকে তিনি এগুলো নিয়ে গেছেন।

পিবিআইর তদন্তের বিরুদ্ধে নারাজি দিলে পরবর্তীতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিকে তদন্তের দায়িত্ব দেন আদালত। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদের কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত করতে আদেশ দেন আদালত। পরে সিআইডির তদন্তেও ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসে।

সিআইডির গভীর অনুসন্ধানের পরে এএসপি সোহেল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার সুস্পষ্ট বিষয় তুলে ধরে আদালতে প্রতিবেদন দেয়া হয়। আপসরফা করতে সুযোগ পেয়েও সিআইডির প্রতিবেদন জমার পরে আদালত এএসপি সোহেল উদ্দিনকে বিষয়টি বাদীনির সাথে আপোষরফার সুযোগ দেন। সাথে এও বলে দেন, আপসরফা না হলে আদালত তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। কিন্তু, সুচতুর সোহেল উদ্দিন কেবল সময় ক্ষেপণ করতে থাকেন।

আদালত আসামি সোহেল উদ্দিনকে আর সময় না দিয়ে তার বিরুদ্ধে গত মঙ্গলবার দণ্ডবিধি আইনের ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। আসামি পক্ষ থেকে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন করা হলেও আদালত তা নাকচ করে দেন। আগামী ১ জুলাই এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।

হাতে অপারেশনের কথা বলে নগর পুলিশের একটি সূত্র জানায়, কোতোয়ালি মডেল থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার সোহেল উদ্দিন তার হাতে অপারেশন করাবেন এজন্য দশ দিনের ছুটির আবেদন করেন। এসএমপি কমিশনারের নিকট এমন কথা বলে তিনি ছুটি নেন।

কিন্তু অপারেশনের কথা বলে তিনি গত মঙ্গলবার মামলার আসামি হিসেবে হাজিরা দেন এবং তার বিরুদ্ধে দন্ডবিধি আইনে বিচারও শুরু হয়েছে। দন্ডবিধি আইনে কোনো সরকারি কর্মচারীর বিচার কার্যক্রম শুরু হলে তাকে বরখাস্ত করার বিধান রয়েছে। মামলার রায় পর্যন্ত তিনি সাময়িক বরখাস্ত থাকবেন। ওই সময় কেবল খোরাকি ভাতা পাবেন।

অভিযুক্ত সোহেল ফোন রিসিভ করেনি :

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে গতকাল বুধবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত বহুবার সহকারী পুলিশ কমিশনার সোহেল উদ্দিনের সরকারি ও ব্যক্তিগত মেবাইল ফোনে কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে একাধিকবার বিস্তারিত লিখে এ প্রতিবেদক ম্যাসেজ দিলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

মহানগর পুলিশ কমিশনার যা বললেন :

যোগাযোগ করা হলে সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম সিলেটের ডাককে বলেন, ‘সে তো আমার কাছে মিথ্যা কথা বলে ছুটি নিয়েছে। হাতে অপারেশনের কথা বলে ঢাকায় গিয়ে মামলায় হাজিরা দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম তার বিরুদ্ধে চার্জ হয়েছে। আমি তাকে ক্লোজড করব। এমন অফিসার দায়িত্বে থাকবে না। এমন অভিযুক্ত কারো বিরুদ্ধে কেবল পুলিশ সদর দপ্তরের পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিধান রয়েছে।’

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০