সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ভাই আমার রাজনৈতিক ও পারিবারিক অভিভাবক ছিলেন । কামরান ভাইয়ের শূন্যতা কোনদিনই পূর্ণ হবে না। তিনি সিলেটের সাধারণ মানুষ ও আওয়ামীলীগকে বটবৃক্ষের ন্যায় আজীবন ছাঁয়া দিয়ে গেছেন।
স্কুল জীবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ভাইয়ের সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠে।
কামরান ভাই যখন প্রথম সিলেট পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন তখন আমি সৈয়দ হাতিম আলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলাম এবং আমি-ই প্রথম কামরান ভাইকে বিজয়ের সংবাদ জানিয়ে ছিলাম ।
পরবর্তীতে যে দুই বার তিনি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন আমিই প্রথম কামরান ভাইকে আমার ভোট কেন্দ্র থেকে বিজয়ের সংবাদ জানাতাম ।
এ কারনে সিলেটের সর্ব-সাধারণের মানুষের আস্থার প্রতীক কামরান ভাই আমাকে লক্ষী ছেলে হিসেবে ডাকতেন । আমার ভাই বোন সবাই প্রবাসে বসবাস করায় এবং পিতা-মাতা হীন আমি যখন একাই জীবন যুদ্ধ করে চলেছি তখন কামরান ভাই, বড় ভাই হিসেবে আমার অভিভাবক হয়ে ছাঁয়ার মত আগলে রেখেছিলেন। আমার যেকোনো আপদ বিপদে একমাত্র অভিভাবক হিসেবে বটবৃক্ষের ন্যায় সব সময় পাশে দাঁড়াতেন বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ভাই।
কামরান ভাইয়ের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে সবাই আমাকে মনে করতো। বিশেষ করে কামরান ভাইয়ের স্ত্রী আসমা কামরান আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মত দেখেন আমিও আমার আপন বড় বোনের মত দেখি। কামরান ভাই মারা যাওয়ার পর আমি আর আমার বড় বোনের সামনে দাঁড়াতে পারিনা, আমাকে দেখলেই ভাবি শুধু কান্নাকাটি করেন।
এই মুহূর্তে আসমা কামরান আপার সাথে দেখা করতে আমার খুবই কষ্ট হয়, কামরান ভাইয়ের শুন্যতায় হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়৷ যে ঘরে দিনের পর দিন কাটিয়েছি কামরান ভাইয়ের স্মৃতি বিজরিত সেই ঘরটায় যেতেও আমার অনেক কষ্ট হয় । কামরান ভাইয়ের স্মৃতি গুলোর সামনে দাঁড়ালে হৃদয়টা হু হু করে কেঁদে উঠে । ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও ভাবির সামনে দাঁড়াতে পারি না এবং সেই ঘরটায় যাওয়াও হয় না ।
কামরান ভাই সিলেটের প্রতিটি মানুষের সুহৃদয়ে মনিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন । মানুষকে ঘিরেই ছিল তাঁর রাজনীতি। মানুষের সুখে দুঃখে পাশে দাঁড়ানো একটা সফল চরিত্রের নাম ছিল বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান। সিলেট মহানগর সহ সর্বস্তরের মানুষ কামরান ভাইয়ের বাসার শোবার ঘরে পর্যন্ত যেতে পারতেন ।
রাত ৩ টা বাজলেও তিনি মানুষের বিপদের কথা শুনলে বাসা থেকে বের হয়ে চলে আসতেন৷ তিনি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হয়ে মহানগরীর অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন। আমার দেখা যে কোন সাহায্যের জন্য নগর এর যে শ্রেনির লোক গেছে উনার কাছ থেকে বিফল হয়ে আসেননি।
কামরান ভাইয়ের স্মৃতি বুকে নিয়েই পথ চলি ।
সিলেট আওয়ামীলীগে কামরান ভাই ছিলেন দেশরত্ন শেখ হাসিনার আস্থার নাম । রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ক্রীড়াঙ্গনে বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান নাম টা ছিল সর্বাগ্রে সমাদৃত। কামরান ভাইয়ের সাথে সিলেটের আনাচেকানাচে সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সফর সঙ্গী হতাম আমি এবং তাঁকে দেখতাম একজন জাদুকরী মানুষ হিসেবে যিনি অসাধারণ গান ও গল্পের মাধ্যমে ভ্রমণকে আনন্দঘন করে তুলতেন।
সিলেট অঞ্চলের ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কামরান ভাই বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারনায় অংশ গ্রহণ করতেন । আমি প্রায় সময়ে উনার সাথে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিভিন্ন জায়গায় যেতাম এবং অবাক চিত্তে লক্ষ্য করতাম কামরান ভাইয়ের অংশ গ্রহণে সেই প্রার্থীর পক্ষে গনজোয়ার তৈরী হতো। উনি যে প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন সে প্রার্থীর নির্বাচনের দিন কামরান ভাই উদগ্রীব থাকতেন সেই প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে কিনা সেটা জানার জন্য । নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই কামরান ভাই আমাকে ফোন করতেন সেই প্রার্থী সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য ।
কামরান ভাই বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনার বিশাল সাপোর্টার ছিলেন। আমিও আর্জেন্টিনা সাপোর্টার তাই কখন আর্জেন্টিনার খেলা আছে তা আমার কাছে ফোন করে জানতে চাইতেন এবং খেলা থাকলে উনার বাসায় চলে যেতে বলতেন একসাথে বসে খেলা দেখার জন্য এবং খেলার জন্য একটা চিন্তায় থাকতেন টিম জিতবে কি না।
এমন করে হাজার স্মৃতি কামরান ভাইয়ের সাথে যা মনে হলে কষ্টে বুকটা ফেটে যায় ।
বিএনপি জামাতের দু:সময়ে কামরান ভাই বুক চিতিয়ে আমাদের রক্ষা করেছেন। সে সময় আমি প্রায় প্রতিদিন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র কামরান ভাইকে মোটর সাইকেলে বিভিন্ন কর্মসূচিতে নিয়ে যেতাম। কামরান ভাইয়ের স্মৃতি লিখিত আকারে লিখে প্রকাশ করা যাবে না। কামরান ভাই অনেক বার আমাদের রক্ষা করার জন্য পুলিশী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন । আজকে কামরান ভাই দুনিয়াতে নেই একথা ভাবতেই আমার হৃদয়ে হাহাকারের প্রতিধ্বনি শুনি । পিতৃতূল্য বড় ভাই হিসেবে উজাড় করে স্নেহ করতেন, ভালোবেসে শাসন করতেন।
মাঝে মাঝে আমাদের মধ্যে মান অভিমান হতো, ভাইয়ে ভাইয়ে যেভাবে মনোমালিন্য হয় সেভাবে। আমাদের মাঝে সেতু বন্ধন হয়ে কাজ করতেন কামরান ভাইয়ের স্ত্রী আমার বড় বোন আসমা কামরান ভাবি । তিনি আমাকে ও কামরান ভাইকে বকাঝকা করে মান অভিমান মিটিয়ে দিতেন।
১/১১ এর সময়ে যখন বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ভাইকে গ্রেফতার করা হয় তখন সিলেটের আওয়ামীলীগের অনেক নেতারা আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে। প্রয়াত আব্দুল খালিক মায়ন ভাই সহ হাতে গণা দু-চার জন নেতা ছাড়া কামরান ভাইয়ের পরিবারের পাশে কেউ ছিল না ।
কামরান ভাই কুমিল্লা কারাগারে বন্দি এই পরিস্থিতিতে উনার সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নমিনেশন নিয়ে ধুম্রজাল তৈরী হলে আমি নিজে তৎকালীন যুবলীগের সংগ্রামী চেয়ারম্যান এড. জাহাঙ্গীর কবির নানক ভাইয়ের সাথে কথা বলি এবং জাহাঙ্গীর কবির নানক ভাই বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ভাইয়ের নমিনেশন বিষয়ে দেশরত্ন শেখ হাসিনার সাথে কথা বলে সমস্যার সমাধান করেন। সেই নির্বাচনে কামরান ভাই জেলে থেকেই সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন।
কামরান ভাই মৃত্যুকে কখনো ভয় পেতেন না ।
কয়েক বার উনার উপর গ্রেনেড হামলা হয়েছিল বিধায় আমি প্রায় সময়ে বলতাম সাবধানে চলাফেরা করার জন্য কিন্তু তিনি বলতেন আমি মানুষের কল্যাণে কাজ করি আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না, প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এটা চিরন্তন । একবার টিলাগড়ে গ্রেনেড হামলা হলে আল্লাহর রহমতে কামরান ভাই সহ আমরা টিলাগড় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে অবস্থান নিয়ে বেঁচে যাই ।
গত বছর এই দিনে সিলেট বাসী সহ বাংলাদেশের কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে এবং আমাকে অভিভাবক শূন্য করে না ফেরার দেশে চলে গেছেন সিলেটের বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ভাই । আজ সিলেটের মাটি ও মানুষের নেতা বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ভাইয়ের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী । সিলেটের মানুষের অতি আপনজন এবং আমার অভিভাবক ছিলেন তিনি । কামরান ভাইয়ের শূন্যতা পূরণ হবার নয় । মহান আল্লাহ তালার কাছে প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন আমার অভিভাবক বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান ভাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন, আমিন।
লেখক: মুশফিক জায়গীরদার
সাধারণ সম্পাদক-সিলেট মহানগর যুবলীগ