স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তরণের পর উন্নত দেশগুলোতে বিদ্যমান শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। এর ফলে দেশের সম্ভাব্য সাড়ে ১৭ বিলিয়ন (১ হাজার ৭৫০ কোটি) মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তবে এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার এরই মধ্যেই বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বলেও জানান তিনি।
সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এতথ্য জানান।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ খুব শিগগিরই এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণ লাভ করতে যাচ্ছে।
এর ফলে বিভিন্ন উন্নত দেশের দেওয়া বিশেষ বাণিজ্য সুবিধাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, যা আমাদের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতি পোষাতে এরই মধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা) স্বাক্ষরের আলোচনা চলছে। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরসিইপি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের মতো বড় বাজারগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) বা সেপা স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির কারণ হিসেবে পূর্ববর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, চলমান জ্বালানি সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের বৈরী পরিস্থিতি আমদানি ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে চড়া মূল্য চোকাতে হচ্ছে। সেই তুলনায় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধীরগতির হওয়ায় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রকট রূপ নিয়েছে।
সংসদে উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ২১ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য সময়ে ৭৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানির বিপরীতে দেশের রপ্তানি আয় ছিল ৫৫ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২০২টি দেশ ও অঞ্চলে পণ্য রপ্তানি করা হলেও মোট আয়ের ৮৪ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একটি মাত্র খাতের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে পোশাক শিল্পের মতো অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতকেও সমান সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার।
রপ্তানি বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার সেবা, হালকা প্রকৌশল, হিমায়িত খাদ্য ও মাছ এবং প্লাস্টিক পণ্য—এই আটটি খাতের আংশিক রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার কম সুদে প্রাক-জাহাজীকরণ ঋণ তহবিল এবং কাঁচামাল আমদানির জন্য রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণের ব্যবস্থা রেখেছে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের জন্য ‘কাগজ ও প্যাকেজিং’ পণ্যকে ‘বর্ষপণ্য’ ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আলীমের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, ভুটানের সঙ্গে ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত পিটিএ চুক্তির আওতায় ১০০টি বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তির আলোচনা এগিয়েছে এবং ভারতের সঙ্গে সেপা চুক্তির প্রস্তুতি চলছে।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার অপর এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া আফগানিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। তবে বিশ্বমঞ্চে রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখতে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।