শনিবার বিকেলে গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির অন্যতম সদস্য আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী গণনার ফল ঘোষণা করেন।
গণনা শেষে সংশ্লিষ্ট কমিটির অফিশিয়াল হিসাবপত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দানবাক্সে প্রাপ্ত বিদেশি মুদ্রা ও অন্যান্য সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ১৩৫ সৌদি রিয়াল; ২ হাজার ৫৩২ ভারতীয় রুপী; ৫৪ (৫৪.২) দিরহাম; ওমানের ১ দিনার ৪৫০ পয়সা; ৪ হাজার ইন্দোনেশিয়ান রুপিয়া; ২০ ইউএস ডলার; ২০ হংকং ডলার; ২০ ইউরো; ১০ সিঙ্গাপুরী ডলার; ২২ কাতার রিয়াল; ৬ মালয়েশিয়ান রিংগিত; ৬০ পাকিস্তানি রুপী পাওয়া যায়।
নগদ টাকা ও বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি দানবাক্স থেকে মূল্যবান অলংকার ও ধাতু পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে: সোনা ৯ গ্রাম; স্বর্ণসদৃশ বস্তু ১০ গ্রাম এবং রূপা পাওয়া যায় ৩৯.৪ গ্রাম।
সর্বশেষ গণনার দিন থেকে গতকাল পর্যন্ত মাজারে ভক্তদের দান করা গবাদি পশুর হিসাবও প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়েছে। এতে দেখা যায় একটি গরু যা লঙ্গরখানায় রান্না করে মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মোট ৬৫টি ছাগল পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪০টি ছাগল লঙ্গরখানায় রান্না করে বিতরণ করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৫টি ছাগল ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
শনিবার দুপুরে মাজারের তিনটি ডেগ ও ছোট-বড় ৫টি দানবাক্স খোলা হয়। পরে ডেগ ও দানবাক্স থেকে টাকা সংগ্রহ করার পর পরই শুরু হয় গণনা।
সকাল ১১টার দিকে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নবগঠিত মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে এই অর্থ গণনা শুরু হয়। গণনা কাজে সহায়তা করছেন মাজার সংলগ্ন মাদরাসার প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী। বিপুল এই অর্থ দ্রুত ও নির্ভুলভাবে গণনার জন্য এবার চারটি মেশিন ব্যবহার করা হয়।
হযরত শাহজালালের (রহ.) মাজারের ৭০০ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো দানবাক্সের টাকা গণনা করা হলো।
এর আগে গত ২২ জুন সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের নেতেৃত্বে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মাজারের দানের টাকা গণনা করা হয়। সে সময় গণনা শেষে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পাওয়া যায়। পরে টাকাগুলো সোনালী ব্যাংকে খোলা একটি নতুন হিসাবে জমা রাখা হয়।
১২ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম শাহজালালের মাজার পরিদর্শনে যান। এরপর মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের উদ্যোগে ১৮ জুন নতুন চারটি দানবাক্স স্থাপন এবং ঐতিহাসিক তিনটি ডেক সিলগালা করা হয়েছিল।
প্রথমবার দানবাক্স খোলার পর জেলা প্রশাসকের এই উদ্যোগ নিয়ে সিলেটে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। এর মধ্যেই সাবেক জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তীকালে ২৬ জুন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে সরকার। এই কমিটিকে এক মাসের মধ্যে মাজারের আর্থিক কাঠামোর জন্য আধুনিক সুপারিশ প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরকে প্রধান করে গঠিত কমিটির অপর সদস্যরা হলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসক রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের শামীম, সিলেটের ডিআইজি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, মাজারের মতোয়াল্লি পরিবারের দুই সদস্য, মাজার মাদরাসা ও মসজিদের দুই প্রতিনিধি। এই কমিটির সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসক।
এদিকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে সব ধরনের দানের পৃথক হিসাব সংরক্ষণ করা হবে।
তিনি জানান, ‘শুধু টাকার হিসাব রাখলে হবে না। কতটি গরু, কতটি ছাগল কিংবা অন্য কোনো মূল্যবান সামগ্রী দান করা হয়েছে, সেগুলোরও পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংরক্ষণ করা হবে। সব ধরনের দানকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হবে।’
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর মতে, প্রকাশ্যে দানবাক্সের টাকা গণনা করাই স্বচ্ছতার জন্য উপযুক্ত।
তিনি জানান, ‘যেহেতু আমরা এই প্রক্রিয়াটি শুরু করেছি, তাই আগামী বৃহস্পতিবারের সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। ভবিষ্যতে দানবাক্সের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হবে, নাকি কমিটির মাধ্যমে হবে- সেই সিদ্ধান্ত সভাতেই নেওয়া হবে।’