সিলেটের ওসমানীনগরের দুই লক্ষাধিক বাসিন্দা গত প্রায় ২ সপ্তাহ ধরে বন্যা কবলিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে বন্যা কবলিত অসংখ্য মানুষ এখনো ত্রাণ বঞ্চিত রয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকে রান্না ও শুকনো খাবার বিতরণ করলেও প্রত্যন্ত এলাকার অসংখ্য মানুষ তা থেকেও বঞ্চিত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন অনেকে।
এমন অবস্থায় চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। দুর্যোগময় মুহুর্তে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সাথে উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয় নেই বলেও জানিয়েছেন অনেকে।
জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত দুই সপ্তাহ ধরে ভয়াবহ বন্যায় উপজেলাবাসী মানবেতর জীবন যাপন করলেও পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ না পাওয়ায় বেশির ভাগ মানুষ এখনো সরকারি ত্রাণ পায়নি। ফলে জনপ্রতিনিধিরাও পড়েছেন বিপাকে। তবে জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং প্রবাসীদের সহযোগিতা নিয়ে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন বলে জানা গেছে।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, বন্যায় উপজেলার ১লাখ ৪৮ হাজার ৩৭৯ জন মানুষ পানিবন্ধি। ঘরবাড়ি ছেড়ে ৫৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১হাজার ৬৭৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। সোমবার পর্যন্ত ৮ ইউনিয়নের জন্য ৯৮ মেট্রিক টন চাল, নগদ সাড়ে ১০ লাখ টাকা এবং ৫’শ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
উপজেলা প্রশাসন প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি বললেও বাস্তবে পুরো উপজেলাবাসী পানিবন্ধি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা। তাদের দাবি, কিছু ঘরবাড়ির ভিঠা উচু থাকায় ঘরে পানি না থাকলেও বাড়ির আঙ্গিনা ও রাস্তাঘাট পানির নিচে। সমস্ত উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো বিচ্ছিন্ন আছে এখনো। এছাড়া সরকারি ভাবে ৫৮টি আশ্রয় কেন্দ্রের কথা বলা হলেও সাদিপুর এবং উসমানপুর ইউনিয়নে ৬৫টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে বলে জানিয়েছেন দুই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।
উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসের তথ্য মতে, ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী উপজেলার লোকসংখ্যা ২লাখ ১হাজার ৩৫৪জন এবং খানার সংখ্যা ৩৩হাজার ৮১০টি। তার মধ্যে কৃষক পরিবার ১৭ হাজার ৫৭৪টি, দিনমজুর পরিবার ৮৬০৬টি এবং দরিদ্র ও হতদরিদ্র লোক সংখ্যা ৩৩ হাজার ৬২৭ জন। গত ১১ বছরে এই সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, স্মরণকালে ভয়াবহ বন্যার কারণে অসংখ্য পরিবার বাধ্য হয়ে আশ্রয় কেন্দ্র এবং বিভিন্ন মার্কেট ও আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিলেও কোন ব্যবস্থা না থাকা ও বাড়ির ঘরের মোহে অসংখ্য পরিবার জলের মধ্যেই বসবাস করছেন। বন্যার কারণে কোন কাজ না থাকায় খাবারের ব্যবস্থা করতে পারছেন না তারা। ফলে তাদের দু’বেলার খাবারের জন্য সরকার এবং ব্যক্তি উদ্যোগে দেয়া ত্রাণ সামগ্রীর দিকে চেয়ে থাকতে হচ্ছে।
বন্যার শুরু থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকেই শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রিতরা এই সুবিধা ভোগ করছে বেশি। যেখানে পানি বেশি ও প্রত্যন্ত এলাকা সেখানে ত্রাণ তৎপরতা তেমন নেই বলে জানান তারা। বন্যার কারণে ভেঙে যাওয়া কাচ ঘরবাড়ি মেরামত করার বিষয় নিয়েও চিন্তিত বানভাসিরা। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া মার্কেট, কমিউনিটি সেন্টার অথবা অন্যত্র আশ্রিতদের হিসাব রাখছে না উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাবেদ আহমদ আম্বিয়া বলেন, বন্যার শুরু থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাধ্য মতো বানভাসি মানুষের মাঝে ত্রাণ সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছি। যেদিকেই যাচ্ছি সরকারি কোন সহযোগিতা না পাওয়া অভিযোগ পাচ্ছি। উপজেলা প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কোন সমন্বয় দেখছিনা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মহাসড়কের পাশের আশ্রয় কেন্দ্রের খোঁজ খবর নিতে দেখা গেলেও গ্রামের মানুষগুলো কিভাবে আছে তার কোন খবর রাখছেন না তিনি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান চৌধুরী নাজলু বলেন, ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসন আমাদের সাথে কোন সমন্বয় করছে না।
সাদিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছা বলেন, প্রায় ২ সপ্তাহ ধরে আমার ইউনিয়নের ৫২ হাজার লোক বন্যা কবলিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ইউনিয়নের ৩০টি আশ্রয় কেন্দ্রে লোকজন উঠেছে। সরকারি ভাবে মাত্র ৯ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছি যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এখন পর্যন্ত একাধিক ওয়ার্ডের অসংখ্য গ্রামে ত্রাণ সহযোগিতা দিতে পারিনি। উপজেলা প্রশাসন জনসংখ্যা বিবেচনায় না নিয়ে প্রতিটি ইউনিয়নের সমান বরাদ্দ দেয়ায় আরও সমস্যা হচ্ছে। আমার ইউনিয়নের অসংখ্য কাচা ঘরবাড়ি বন্যার কারণে ভেঙে গেছে। উপজেলা প্রশাসন এব্যাপারে আমাদের কাছে কোন তথ্য এখনো চায়নি।
উসমানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওয়ালি উল্ল্যাহ বদরুল বলেন, আমার ইউনিয়নের মানুষ সবার আগে বন্যা কবলিত হয়েছে। ৬০ সহ¯্রাধিক জনসংখ্যার ইউনয়নের প্রায় প্রতিটি পরিবার বন্যা আক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৬ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছি। ফলে অসংখ্য গ্রামে এখনো সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌছে দিতে পারিনি।
বুরুঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আখলাকুর রহমান বলেন, ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রাম বন্যা কবলিত হওয়ায় ইউনিয়নের প্রায় ৪৫ হাজার লোক মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এখন পর্যন্ত ১১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছি যা পর্যাপ্ত নয়।
দয়ামীর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এসটিএম ফখর উদ্দিন বলেন, আমার ইউনিয়নের ৩০ সহ¯্রাধিক বন্যা কবলিত মানুষের জন্য ১০টন চাল ও সাড়ে ৩শ’ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পেয়েছি। বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। অনেক ব্যক্তি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বন্যার্তদের ত্রাণ সহযোগিতা দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
একইভাবে উমরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া, তাজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অরুনোদয় পাল ঝলক, পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী চৌধুরী সুমন প্রয়োজনের তুলনায় কম বরাদ্দ পাওয়ায় অনেক মানুষকে ত্রাণের দিতে পারেননি বলে জানান তারা। তবে সকলেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মিলন কান্তি রায় বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা ৯৮ মেট্রিক টন চাল, নগদ সাড়ে ১০লাখ টাকা এবং ৫’শ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পেয়েছি যা বিতরণ করা হয়েছে। ত্রাণ অপর্যাপ্ত হওয়ায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নতুন করে ১’শ মেট্রিক টন চাল, নগদ টাকা ও শুকনো খাবারের চাহিদা পাঠিয়েছি। সরকারি ভবন ছাড়া অন্যত্র আশ্রিতদের হিসাব তাদের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।
এ ব্যাপারে জানতে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নীলিমা রায়হানার মুঠো ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, ত্রাণ প্রয়োজন হলে আমরা আরো বরাদ্দ দেব, আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ রয়েছে।