সিলেটিরা আরাম প্রিয়। বেশীর ভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তালা খোলা হয় সকাল ১১টার পর। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বনি বাট্রাও হয় অনেক দেরীতে। এরমাঝে জ্বালানি সাশ্রয় ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনতে রোববার সরকার দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধের সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে বাড়িয়ে ৭টা নির্ধারণ করেছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত এক ঘন্টা বাড়িয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত করার দাবি জানিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা এই সিদ্ধান্তে আপাতত সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন সিলেটের ব্যবসায়ীরা।
সোমবার (০৭ এপ্রিল) সোয়া ৭টার দিকে নাইওরপুল থেকে ধোপাদিঘীর পূর্বপাড়-জেলরোড পর্যন্ত সব দোকানপাট খুলা থাকতে দেখা যায়। এমনকি কোনো দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতিও লক্ষ্য করা যায়নি।
এদিকে জিন্দাবাজার গড়ে ৯০% ভাগ দোকানপাট ব্যবসায়ীরা বন্ধ করেছেন, বন্ধের প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। কালেক্টরেট মসজিদ ঘেষা সড়ক হয়ে জিন্দাবাজার পর্যন্ত শতকরা ১০% দোকান খোলা থাকতে দেখা গেছে।
পারিস মিয়া নামে বন্দরবাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, ৭টায় দোকান লাগানোর প্রস্তুতি নিতে গেলে ৮টা হয়ে যায়। এছাড়াও একাধিক ব্যবসায়ীর সাথে কথা হলে তারা জানান, ৭টার পরিবর্তে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলার দাবি জানান তারা।
এদিকে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নগরীর জিন্দাবাজারের সিলেট প্লাজা মার্কেটের সব দোকান বন্ধ। এসময় কথা হয় মোহনা এর পরিচালক শাহিন আহমদ’র সাথে।
তিনি শ্যামল সিলেটকে বলেন, সরকারতো জাতীয়ভাবে চিন্তা করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। তবে ৭টার পরিবর্তে ৮টা করা হলে বেশ ভালো হতো। এমনিতেই আমরা সিলেটিরা দোকান খুলতে খুলতে ঘড়ির কাটায় বেজে যায় ১১টা। রাত ৮টা পর্যন্ত সময় নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছি।
অপরদিকে, মিরাবাজার, শিবগঞ্জ বাজার, টিলাগড়সহ বিভিন্ন বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো রাত ৯টার পরও খোলা থাকতে দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে মার্কেটের মাইকে ঘোষণা প্রচার করেছেন সিলেট নগরীর অনেক কর্তৃপক্ষ। রোববার বিকেলেই তারা মার্কেটে ঘোষণার মাধ্যমে সকল ব্যবসায়ীকে সরকার নির্ধারিত সময়ে দোকানপাট বন্ধের অনুরোধ জানান।
রোববার বিকেলে মার্কেটের মাইকে দোকান বন্ধের ঘোষণা প্রচার করা হয় জানিয়ে করিম উল্লাহ মার্কেটে নিচ তলার নিবরাস এর বর্তমান পরিচালক মঞ্জুর আহমদ বলেন, আগের ৬টার চেয়ে রাত ৭টার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট তবে ৮টা হলে খুব খুশী হতাম। কারণ ব্যবসার যে অবস্থা অনেক সময় আসর বা মাগরিবের পরে বনি-বাট্রাও হয়। তাছাড়া সিলেটিরা একটু আরাম প্রিয় হওয়াতে দোকান খুলেনও দেরীতে। তাই রাত ৮টা পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করার দাবি আমার।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ট্রাভেল ব্যবসায়ী বলেন, নতুন সময়সূচি অনুযায়ী সরকারি অফিস বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকায় অফিস শেষে ক্রেতাদের হাতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় থাকছে কেনাকাটার জন্য। এতে করে কর্মজীবী মানুষের জন্য কেনাকাটা সহজ হবে এবং বিকেলের ব্যস্ত সময়ে বাজারে ক্রেতা উপস্থিতি বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
শিবগঞ্জ বাজারের আলামিন ট্রেডার্সের পরিচালক সুহাইল আহমদ বলেন, ঢালাওভাবে ৭টায় সব দোকান বন্ধের নির্দেশনা যুক্তিযুক্ত নয়। ব্যবসা ভেদে সময় নির্ধারণ করার জানিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকানগুলোর জন্য সময় আরও বৃদ্ধি করার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলার মহাসচিব ও সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন বলেন, দোকানপাট বন্ধের সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের যে ক্ষতি হচ্ছে না তা নয়, ক্ষতি অবশ্যই হচ্ছে। বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে সিলেটের চিত্রটা একটু ভিন্ন। সিলেটে বেলা ১২টার আগে কাস্টমারই আসে না সদাই বা কেনাকাটা করতে। আমরা ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে রাত ৮টা দাবি করেছিলাম, এখনও একই দাবি আমাদের। তবে সরকার ৬টা থেকে ১ ঘন্টা বাড়িয়ে ৭টা করেছেন।
ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রী বরাবর দাবী জানিয়েছি যাতে ভ্যাট টেক্স ইত্যাদি আনুসাঙ্গিক বিষয়ের প্রতি নমনীয় হতে, যাতে করে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি পুসায়।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দি সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি’র প্রশাসক পিংকি সাহা বলেন, আমি ছুটিতে আছি। আপনি বিকেলে বা সন্ধ্যায় দিকে যোগাযোগ করুন। পরে তাঁর সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’র পরিচালক তাহমিনা হাসান চৌধুরী বলেন, ব্যবসায় অবশ্যই একটা প্রভাব পড়বে। তবে দেশের স্বার্থে এই নির্দেশনা মানার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে সন্ধ্যার দিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের নির্দেশনা ব্যবসায়ীরা মানার অভ্যাস করলে ক্রেতারাও সময় অনুযায়ী কেনাকাটা করে নেবেন।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে সন্ধ্যা ৬টায় দেশের সব দোকানপাট ও শপিং মল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রিসভা। তবে রাত আটটা পর্যন্ত ব্যবসা করার সুযোগ চেয়ে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি অনুরোধ জানান বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতির নেতারা।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন বলেন, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসন মাঠে কাজ করছে। তারপরও যেসব এলাকার মানুষজন এই নির্দেশনা সম্পর্কে জ্ঞাত নয়, সেসব এলায়ায় মাইকিং করানোর মাধ্যমে নির্দেশনা জানানো হবে।