আজ শনিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ছালামির জন্য এঘর-ওঘর যেতাম

আতিকুর রহমান নগরী, সম্পাদক
প্রকাশিত মার্চ ২০, ২০২৬, ০৩:২৫ পূর্বাহ্ণ
ছালামির জন্য এঘর-ওঘর যেতাম

নব্বই দশকের কথা যখন খুব ছোট ছিলাম আমরা। ঘুমে থাকাবস্থায় ঈদের ৩/৪ দিন আগে কোনো এক রাতে নতুন শার্ট-পেন্ট নিয়ে আসতেন আব্বা। সকালে আম্মা কাপড় দেখাতেন। নতুন কাপড় দেখে একবার পরিধান না করলে কি আর হতো। চাচাতো ভাই-বোনেরা ঘরে ঢুকছে ঠের পেলেই লুকিয়ে ফেলতাম কাপড়। অন্য কেউ ঈদের জামা দেখলে ‘ঈদ নাকি চলে যায়’ সেই ভয়ে বাড়ির ছোট সবাই কেউ কাউকে দেখাতাম না।

তখন আমরা আব্বা বা ভাইদের সাথে মার্কেটে শপিং করতে যেতাম না। তারা যা কিনে আনতে, তাই ছিল পছন্দের। সেটাই ছিল সেরা। তখনকার ঈদটা ছিল আনন্দের। ছিল হাসিখুশীর। ঈদের আগের দিন ইফতারের পরপরই বাড়ির ভেতরে বা অন্যবাড়ির ছাদে গিয়ে কে আর আগে দৌড়ে গিয়ে উঠতে পারি চাঁদ দেখার জন্য। এই কম্পিটিশন ছিল আমাদের ছোটদের মাঝে।

রমজান শুরু মানে আমাদের রোজার ঈদের দিনক্ষণ মনে রাখার প্রস্তুতি। ঈদের কয়েক দিন আগে থেকেই ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, নতুন জামা কেনা, আর মজার খাবার তৈরির ধুম শুরু হতো। বাজার থেকে সেমাই, দুধ, মাংসসহ নানান কেনাকাটা চলতো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। সেসময়ের চাঁদ রাত মানেই ছিল আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরা এক জাদুকরি রাত। চাঁদ দেখার অপেক্ষা, নতুন জামা গুছিয়ে রাখা, হাত ভর্তি মেহেদি আর বন্ধুদের সঙ্গে রাতভর মজা—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি। মায়ের রান্নার ঘ্রাণ, ভাই-বাবাদের আতর-টুপি কেনা আর ঈদের দিন কত টাকা সালামি পাবো সে হিসাব করতে করতেই কখন যে রাত কেটে যেত। সবকিছুতেই ছিল এক অন্যরকম উত্তেজনা।

মনে পড়ে সাদাকালাে টেলিভিশনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত সাড়াজাগানো ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাকীদ। তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ, দে যাকাত মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙ্গাইতে নিদ।’ গানটি বাজতো, যা এখনো ঈদ এলে বাজে। টিভিতে গান বাজছে, আর এদিকে ঘরের মহিলারা পিঠাপুলি তৈরীতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

ঈদের দিন খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতাম। গোসল করে পিঠা খেয়ে নতুন কাপড় পড়ে আব্বার সাথে ঈদগাহে যেতাম। নতুন কাপড় পড়লেও নতুন জুতোর বদলে পুরনো জুতা নিয়ে ঈদগাহে যেতাম চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে। ঈদের নামাজের পর বাড়িতে ফিরেই এঘর-ওঘরে গিয়ে চাচা-চাচী, বড় ভাই-বোনদের সালাম করে দাঁড়িয়ে থাকতাম যতো সময় না ছালামি পেয়েছি। বাড়ির পালা শেষ করে আশপাশের চাচাদের বাড়িতে যাওয়া হতো। মনে পড়ে দোয়েল পাখির ছবি সম্বলিত দুই টাকার নতুন চকচকে নোটের কথা। এই নোটটাই বেশী পেতাম ছালামি হিসেবে। মাঝে মাঝে বড় নোট হিসেবে দশ, বিশ টাকার নোট হাতে আসতো।

ঘন্টাখানেক পর ঘরে গিয়ে আবার কিছু খাওয়া হতো। পরে বাড়ির সামনের দোকানে যাওয়া হতো রঙিন বেলুন, ঠান্ডা, চিপস ইত্যাদী কিনে এনে বেজায় খুশী হয়ে সব ছোটরা মিলে খেলা করতাম। এভাবেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যেতো। পরে আব্বার সাথে নানাবাড়ি বা ফুফুর বাড়িতে বেড়ানোর পালা আসতো। সন্ধ্যার পরপরই বাড়ি ফেরা। এরপর টিভিতে ঈদের অনুষ্ঠান দেখতে সবাই একত্র হয়ে যেতেন। রাত ৮টা কিংবা ৯টা হলেই আমরা ছোটরা তো ঘুমের রাজ্যে চলে যেতাম।

নব্বই দশকের ঈদ উদযাপন এভাবেই ছিল। আর এখনকার সময় কি আর এসব দৃশ্য দেখা যাবে। ফিরে কি আসবে সেই শৈশব। কালের বিবর্তনে হারিয়ে আমাদের ছোটবেলা। আজ ছোট্র সোনামনীরা আছে কিন্তু নেই সেই সোনালী সময়কাল। নেই হৈচৈ, নেই আনন্দঘন পরিবেশ। সবই কেড়ে নিয়েছে হাতে থাকা মুঠোফোন। বাচ্চারা মার্কেটে গভীর রাত রাত পর্যন্ত মা-বাবাদের সাথে শপিংয়ে কাটায়। ঈদের সকালে আজ বাড়িগুলো বড্ড ফাঁকা থাকে। সব ঘরে ছোটরা আছে, কিন্তু নিস্তবদ্ধতায় বুঝা যায় যেনো আমাদের বাড়িতে নেই কোনো ছোট্র পাখিরা। আজ মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত আমাদের সোনামনীরা।

আমরাও ঈদানন্দ পানসে করে দিয়েছি। আমরা রীতিমতো মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি। আফসোস আমাদের সময়কার ঈদ যদি আবার আসতো। যে কালে ছিল না ঈদ শপিংয়ের সেলফি তোলা। ঈদের জামায় নিজেকে ক্যামেরাবন্দী করে ফেসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপে পোস্ট বা স্টোরি দেয়া। ছিলনা ভিডিওকলে ঈদের জামা দেখানো কোনো ওয়ে। স্যোসাল মিডিয়াহীন ছিল আমাদের ঈদ, এরপরও বলবো নব্বই দশকের আমাদের ছোটবেলার ঈদই ছিল সেরা।

মানুষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে যায় আনন্দময় মুহুর্তগুলো। বাড়ে দায়িত্ববোধ। সে বোধটা কেমন যেন কঠিন। ছোটবেলার সেই আনন্দবোধের সঙ্গে একে মেলাতে পারি না। মাঝে মাঝে ভাবি, আমি তো বড় হতে চাইনি। ছোটই থাকতে চেয়েছিলাম। অনেক ছোট।

সময়ের সাথে বয়ে যায় মানুষের জীবন। স্মৃতির মানসপটে উঁকি দেয় ফেলে আসা দিনগুলো। তাই স্মৃতিরাই পিছু টানে। কিন্তু সেখানে আর যেতে পারি না। কবির কথা মনে পড়ে। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘সে জানতো— সবাই জানে/ শৈশবে আর ফেরা যায় না।’ সে আমিও জানি। শৈশবে আর ফিরতে পারবো না। তাই তো স্মৃতিটুকু রেখে গেলাম কালির আচড়ে।

তবুও বলবো, সবার ঈদ কাটুক আনন্দে। কারণ ঈদ মানেই তো আনন্দ। ঈদ মানেই তো খুশি। শৈশব কী যৌবনে- এ আনন্দধারা চির বহমান থাকুক। ছোটবেলার সাথীরা সুখে থাকুক। এখন যারা ছোট- ঈদের খুশিতে ওদের হৃদয়ও ভরে উঠুক কানায় কানায়!

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০