আজ শনিবার, ১১ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইতিকাফ: আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনার অন্যতম সোপান

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত মার্চ ১৬, ২০২৫, ০৮:০৮ অপরাহ্ণ
ইতিকাফ: আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনার অন্যতম সোপান

লিখেছেন: মুফতি হাবিবুর রহমান:: ইতিকাফ। উত্তম ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদতের মধ্যে একটি। ঈমানি তরবিয়ত ও শিষ্টাচার অর্জনের একটি পাঠশালা। ঈমান বৃদ্বির একটি দারুণ সুযোগ। আমাদের জন্য ও আমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য আল্লাহ তাআলা এটা বিধানভুক্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
আমি আদেশ দিলাম যে, ‘তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর।’ আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ‘ইতিকাফকারী ও রুকূকারী-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর।-সূরা আল বাকারা:১২৫

রাসূল সা. ইতিকাফকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। মদিনায় অবস্থান কালে রাসুল (সা.) প্রতি বছরই ইতিকাফ পালন করেছেন। ইতিকাফ সারা বছরই সুন্নত। তবে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করাই উত্তম। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশদিন সবসময় ইতিকাফ করে গেছেন।
হাদিস শরীফে এসেছে- আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) প্রতি রমজানে ১০ দিন ইতিকাফ করতেন, তবে যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি ২০ দিন ইতিকাফে কাটান।-বুখারি, হাদিস নং: ১৯০৩)

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘ইন্তেকাল পর্যন্ত রাসুল (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন, এর পর তার স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন।’ (বুখারি, হাদিস নং: ১৮৬৮; মুসলিম, হাদিস নং: ২০০৬)

রাসুল (সা.) বলেন, আমি কদরের রাতের তালাশে প্রথম ১০ দিন ইতিকাফ করলাম, এরপর ইতিকাফ করলাম মধ্যবর্তী ১০ দিন, অতপর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানানো হলো যে, তা শেষ ১০ দিনে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ইতিকাফ পছন্দ করে, সে যেন ইতিকাফে বসে। (মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৯৪)
ই‘তিকাফের উদ্দেশ্য হ’ল আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন করা। নিজের গোনাহ মাফ করে নেওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হ’ল ই‘তিকাফ। তাবেঈ মাসরূক (রহঃ) বলেন, ব্যক্তির জন্য করণীয় হ’ল সে এমন কোন স্থানে একাকী হবে, যেখানে সে নিজের গোনাহ স্মরণ করে তা হ’তে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। এক্ষেত্রে ই‘তিকাফ এক উত্তম মাধ্যম। আর এর মাধ্যমে ‘লাইলাতুল ক্বদরকে’ অন্বেষণ করা যায়।

ই‘তিকাফকে দু’ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা-সুন্নাত ও ওয়াজিব।
সুন্নাত : সুন্নাত ই‘তিকাফ হ’ল যেটা রাসূল সা. ও তাঁর স্ত্রীগণ এবং ছাহাবায়ে কেরাম করেছেন। আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘রাসূল (ছাঃ) মৃত্যু পর্যন্ত রামাযান মাসের শেষ দশ দিন ই‘তিকাফ করেছেন। অতঃপর তাঁর পরে তাঁর স্ত্রীগণ ই‘তিকাফ করেছেন’।
বুখারী হা/২০২৬; মুসলিম হা/১১৭২।
ওয়াজিব : ওয়াজিব ই‘তিকাফ হ’ল, যা ই‘তিকাফকারী নিজের উপর আবশ্যক করে নেয়। যেমন যদি কেউ কোন ভালো কাজের উদ্দেশ্যে ই‘তিকাফ করার মান্নত করে তাহ’লে তার মান্নত পূরণ করা আবশ্যক। ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন,
‘ওমর (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেন যে, আমি জাহেলী যুগে মসজিদুল হারামে এক রাত ই‘তিকাফ করার মানত করেছিলাম (আমি কি তা পূরণ করব?) নবী করীম (ছাঃ) বললেন, তোমার মানত পূরণ কর’।-বুখারী হা/২০৩২

যেসব কাজ করলে ই‘তিকাফ ভঙ্গ হয়ঃ
(১) শারঈ ওযর ব্যতীত মসজিদ থেকে বের হওয়া : ই‘তিকাফকারী কোন অবস্থাতেই মসজিদ থেকে বের হবে না। তবে পানাহার, প্রস্রাব-পায়খানা এবং শারঈ কোন ওযর থাকলে বের হ’তে পারবে। আয়েশা (রাঃ) বলেন,
ই‘তিকাফকারীর জন্য সুন্নাত হচ্ছে, সে কোন রোগীর সেবা করতে মসজিদ থেকে বের হবে না। কোন জানাযায় উপস্থিত হবে না। স্ত্রীর সাথে সহবাস করবে না। (শারঈ) প্রয়োজন ব্যতীত মসজিদ থেকে বের হবে না। ছিয়াম ব্যতীত কোন ই‘তিকাফ নেই। জামে মসজিদ ব্যতীত কোন ই‘তিকাফ নেই।
আবু দাউদ হা/২৪৭৩ সনদ ছহীহ; বায়হাক্বী ৪/৩১৫।
(২)স্ত্রী সহবাস : স্ত্রী সহবাস করলে ই‘তিকাফ বাতিল হয়ে যাবে।আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
তোমরা স্ত্রীগমন করো না যখন তোমরা মসজিদে ই‘তেকাফ অবস্থায় থাক’ (বাক্বারাহ ২/১৮৭)।
(৩) ই’তেকাফের জন্য রোযা শর্ত। তাই কেউ যদি রোযা ভেঙে ফেলে তাহলে তার ইতেকাফও ভেঙে যাবে।
(৪)ওযুর কারণ ছাড়া শুধু এমনিতেই ব্রাশ, মেসওয়াক করতে বের হলে।
(৫)বিড়ি খাওয়ার জন্য বের হলে।
(৬).স্ত্রীর সাথে সহবাস করার দ্বারা ইতেকাফ ভেঙে যাবে,চাই সহবাস ইচ্ছে করে হোক বা অনিচ্ছাকৃত।ইত্যাদি।
ই‘তিকাফকারীর জন্য যা বৈধ :
ক. মসজিদের একাংশে তাঁবু টাঙ্গানো : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন ই‘তিকাফের ইচ্ছা করতেন তখন আয়েশা (রাঃ) মসজিদে তাঁবু টাঙ্গিয়ে দিতেন।
বুখারী হা/২০৩৩।
খ. মসজিদে ওযূ ও গোসল করা : রাসূল (ছাঃ)-এর খাদেম আনাস (রাঃ) বলেন،
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) খুব অল্প পানি খরচ করে মসজিদে ওযূ করেছেন।
ছহীহ্ আহমাদ ৫/৩৬৪
গ. মসজিদে বিছানার ব্যবস্থা করা :
ই‘তিকাফকারীর জন্য মসজিদে বিছানা বিছানো যায়। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়,- ‘একুশতম দিনের সকালে আমরা আমাদের বিছানা পত্র সরিয়ে দিলাম’।
ঘ. স্ত্রীর সাথে কথা বলা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর স্ত্রী ছাফিয়া (রাঃ)-এর সাথে কথা বলেছেন। ছাফিয়া (রাঃ) বলেন, রামাযান মাসের শেষ দশ দিনে তিনি একবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে দেখতে আসলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর সাথে অনেক্ষণ কথা বললেন। এরপর তিনি উঠে গেলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁর সাথে উঠলেন এবং মসজিদের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।
বুখারী হা/২০৩৫; ছহীহ্ মুসলিম, হা/২১৭৫।
ইত্যাদি।
ইতিকাফ করলে যাবতীয় গোনাহ থেকে মুক্ত থাকা যায়। দুই হজ ও দুই ওমরার সওয়াব পাওয়া যায়।
সাহাবী ইবনে আব্বাস রা. থেকে একটি হাদীস বর্ণিত,আল্লাহর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ইতিকাফকারী সর্ব প্রকার পাপ হতে মুক্ত থাকে এবং অন্যরা বাইরে আমল করে যে নেকী লাভ করে সে ইতিকাফে থেকে বাইরের আমলগুলো না করেও সেই পরিমাণ নেকী লাভ করে। [ইবনে মাজাহ: ১৭৮১]
আরেক হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রমাযান মাসে দশ দিন ইতিকাফ করবে, তার এই ইতিকাফ নেকী ও শ্রেষ্টত্বের বিবেচনায় দুটি হজ¦ ও দুটি ওমরার সমপর্যায়ের হবে। [শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস: ৩৬৮০, ৩৬৮১]
পরিশেষে, ইতিকাফের মাধ্যমে মুসলমানের অন্তরের কঠোরতা দূর হয়। দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসায় ছেদ পড়ে আত্মিক উন্নতির অভিজ্ঞতা অনুভূত হয়। অন্তরে প্রশান্তি আসে। বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াতের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ঐকান্তিকভাবে তওবা করার সুযোগ লাভ হয়। সর্বোপরি সময়কে সুন্দরভাবে কাজে লাগানোর এক যোগ্যতা তৈরি হয়। তাই ইতিকাফকে বলা চলে, দশ দিন মেয়াদি আধ্যাত্মিক উন্নতির সাধনার এক পবিত্রতম সোপান।

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০