আজ রবিবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শায়খে বিশ্বনাথী রাহ.’র সংক্ষিপ্ত জীবনী

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত মে ২১, ২০২৫, ০৩:০৪ অপরাহ্ণ
শায়খে বিশ্বনাথী রাহ.’র সংক্ষিপ্ত জীবনী

লিখেছেন: হাসান বিন ফাহিম: : ইতিহাসবিদদের মতে হালাকু খানের চেয়ে ইসলামের বহু গুণ বেশী ক্ষতি করেছে সম্রাট আকবর।হালাকু খান মুসলমানদের শহিদ করেছে, আকবর কেড়েছে ঈমান।আকবরের ‘দ্বীনে এলাহি’ দিয়ে উপমহাদেশে মুসলমানদের ঈমান ধ্বংষের রাষ্ট্রীয় যন্ত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।আকবরের ফেরআউনী তৎপরতার বিপরীতে মুসা আ.এর ভূমিকায় আবির্ভূত হন মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাহ.।মুজাদ্দিদের ঈমানী আন্দোলনের তীব্রতা ক্রমেই আকবরী মিশনকে নিস্তেজ করতে থাকে।

মুজাদ্দিদের লড়াকু চেতনার কেতন ধারণ করে পরবর্তিতে উপমহাদেশে বিরাট ঈমানী বিপ্লব সৃষ্টি করেন শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী রাহ.।মুহাদ্দীসে দেহলভীর বিপ্লব ১৮৬৬সালে দারুল উলুম দেওবন্দ নামে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ ধারণ করে।দারুল উলুম খুব কম সময়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়।ইসলামি শিক্ষার প্রচার ও প্রসার,বাতিলের মুকাবেলায় ইসলামের তাহাফফুজ,তাযকিয়ায়ে নাফস,তাবলীগ ও তাগলীবে দ্বীনের বহুমূখি প্রোগ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম সরবরাহ করতে থাকে মুজাদ্দিদে আলফে সানী রাহ.’র হাজার হাজার উত্তরসূরি।দারুল উলুম বিশ্বজুড়ে গতিসম্পন্ন বৃহৎ আন্দোলন ও বিপ্লবে পরিণত হয়।

আল্লামা শায়খ আশরাফ আলী বিশ্বনাথী রাহ. ছিলেন দেওবন্দ আন্দোলনের সোনালী ফসল ও আকাবিরে দেওবন্দের অন্যতম প্রতিচ্ছবি।ইসলামি শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে তিনি জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া বিশ্বনাথ ও জামিয়া মাদানিয়া ক্বাওমিয়া মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।প্রতিষ্ঠান দুটি এতদঞ্চলে আকবরী কুসংস্কার ও বৃটিশ সৃষ্ট বাতিল মতবাদকে চরমভাবে আঘাত করে এবং আধার বিদূরিত করে আলোর বিস্তারে নেপথ্য শক্তি হয়ে ওঠে।দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাজার হাজার আলেম-আলেমা,হাফিয-হাফিযা,মুফতি,মুহাদ্দিস,মুফাসসির ও মুবাল্লিগ সরবরাহে অর্ধ শতাব্দিরও বেশী সময় ধরে প্রতিষ্ঠান দুটি অনন্য অবদান রেখে চলেছে।

মাদরাসা দ্বীনের কেন্দ্র।স্থানে স্থানে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও রিজাল তৈরী দেওবন্দের প্রধানতম মিশন।মাদরাসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শায়খে বিশ্বনাথী রাহ.বলতেন “লোকেরা বলে মাদরাসাগুলো কী করছে?যে শক্তি মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানায় মাদরাসাগুলো সে শক্তি সরবরাহ করছে”। তিনি তাঁর জামিয়া থেকে ইমাম গাজালী ও মুজাদ্দিদে আলফে সানী তৈরীর স্বপ্ন দেখতেন।যারা বাতিল মতবাদের শেঁকড় উপড়ে ফেলে ইসলামকে সুরক্ষিত রাখবে।ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলতেন-” হাজার হাজার ছাত্র চাই না,এক ইমাম গাজালী যথেষ্ট”।বিশ্বনাথে জামিয়া মাদানিয়া প্রতিষ্ঠার প্রভাব সম্পর্কে আল্লামা আব্দুশ শহীদ গলমুকাপনী ও শায়খ নূরুল ইসলাম মইজপুরী রাহি.বলেন-“বাতিল মতবাদের বিপরীতে শায়খে বিশ্বনাথী যদি দৃঢ়পদে না দাঁড়াতেন।জীবন-যৌবন উজাড় করে যদি জামিয়া মাদানিয়া ধরে না রাখতেন তাহলে বিশ্বনাথে আহলে হক্বের পা রাখার স্থান হতো না”।

শায়খে বিশ্বনাথী রাহ.মদীনাতুররাসুল থেকে দেওবন্দ হয়ে আসা বা-সনদ দ্বীনি চেতনার ধারক ও বাহক ছিলেন।তা’লীম-তাআল্লুমের পাশাপাশি এশাআতে দ্বীন,তাযকিয়ে নাফস,তাহাফফুজ ও তাগলীবে দ্বীনে তিনি অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন।বয়ান-বক্তৃতা,বিবৃতির পাশাপাশি লেখেছেন ডজনখানেক মূল্যবান পুস্তক।সাতের দশকে মওদুদী ফিতনা নিয়ে তাঁর লেখা “মওদুদী ইসলামের সংক্ষিপ্ত নমুনা” বইটি সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তাহাফফুজে দ্বীনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।’মক্তব পাঠ’ নামে বর্ণমালা শিক্ষার বই রচনা করে পঞ্চাশ হাজার কপি বিতরণের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে অতুলনীয় অবদান রাখেন।নয়’র দশকে মাসিক আল ফারুক প্রতিষ্ঠা ও নিয়মিত প্রকাশের মাধ্যমে সমাজে ইসলামী তাহযিব-তমদ্দুন ও বাংলা ভাষায় ইসলামি ভাবধারার বিস্তারে কাজ করেন।

হযরত কুতবে আলম মাদানী রাহ.’র সিলসিলায় তাসাউফ জগতে তিনি ছিলে ক্বায়িদুল উলামা শায়খে কৌড়িয়া রাহ.’র প্রধানতম খলিফা।বাতিলের বিরুদ্ধে তিনি সদা আপোষহীন ছিলেন।তাঁর প্রতিরোধ শক্তির সামনে বিশ্বনাথে অসামাজিক কার্যকলাপ,অপসাংস্কৃতি চর্চার হিম্মত কারো ছিলো না।সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী ব্যরিষ্টার নাজমুল হুদাকে জামিয়া মাদানিয়ার সামন দিয়ে বাজনা বাজিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।খবর পেয়ে তিনি তাৎক্ষনিক প্রতিবাদ সভা আয়োজন করেন।পর দিন সিলেটের স্থানীয় দৈনিকগুলোতে শিরোনাম ছিলো-“হিন্দুরা যে সাহস দেখায় নি,মন্ত্রী সে সাহস দেখালেন-শায়খে বিশ্বনাথী”।

বন্যা,সিডরসহ প্রকৃতিক দূর্যোগগুলোতে তিনি কবলিত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যেতেন।ইরাক,আফগান ও কাস্মীরে হামলার প্রতিবাদে বহু কর্মসূচিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভারতের টিপাইবাধের প্রতিবাদে ঐতিহাসিক লংমার্চে তিনি ছিলেন অন্যতম নেতা।লংমার্চ পরবর্তি ঐতিহাসিক সমাবেশে তিনি সভাপতিত্ব করেন।মুক্তিযুদ্ধে হিন্দুদের ঘর-বাড়ি রক্ষা ও বেসামরিক মানুষের জান-মালের হেফাজতে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন।

বৃটিশ বিরুধী আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে জড়ান।১৯৬৪সালে পূর্ব পাকিস্থানে জমিয়তের কার্যক্রম শুরু হয় তাঁর ঐতিহাসিক চিঠির সূত্র ধরে।সিলেট জেলা(বর্তমান বিভাগ)জমিয়তের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নির্বাহী সভাপতি ও আমৃত্য সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।জমিয়ত ও শায়খে বিশ্বনাথী যেন একটি আরেকটির প্রতিশব্দ।জমিয়তের তরে সবচ’ বেশী জানী-মালী কুরবানী দিয়ে জমিয়ত প্রতিষ্ঠা ও বিস্তৃতিতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ জমিয়ত তাঁকে বরণ করেছে বাবায়ে জমিয়ত তথা জমিয়ত জনক হিসেবে।শায়খে বিশ্বনাথী রাহ.’র রাজনৈতিক জীবন আলোচনায় বৃহৎ কলেবর প্রয়োজন।

লেখক-বিভাগীয় সম্পাদক মাসিক আল ফারুক

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০