মূল রিপোর্ট: দৈনিক শ্যামল সিলেট
‘‘ধুম মাচালে ধুম” বলিউডের সিনেমকেও যেন হার মানিয়েছে সিলেট নগরীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা। সিনেমায় যেমন অপরাধীরা একের পর এক অপরাধ করে পালিয়ে যায়। পুলিশ তাদের ধরতে হিমশিম খায়। কৌশল পরিবর্তন করে আবারও অপরাধ ঘটায়, এভাবেই চলে চোর-পুলিশ খেলা।
অবশ্য মুভিতে শেষ পর্যন্ত অপরাধীরা একটা সময় পুলিশের খাঁচা বন্দি হয়। কিন্তু সিলেট নগরীতে আলোচিত কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় অপরাধীরা অধরাই রয়ে গেছে।
সময়ে সময়ে কৌশল বদলে ঘটছে অপরাধ অপকর্ম। সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকায়ও সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের মাত্রা নিয়ে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। ছিনতাই, চুরি, মাদক কারবার, কিশোর গ্যাংয়ের বেপরোয়া তৎপরতা—সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসী।
সম্প্রতি নগরীর আম্বরখানা থেকে শাহী ঈদগাহ যাওয়ার পথে সিএনজি অটোরিকশায় ছিনতাইয়ের শিকার হন সাংবাদিক ও কলেজ শিক্ষক ওহি আলম রেজা। দিনদুপুরে তার শিশু সন্তানের গলায় ছুরি ধরে ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় যাত্রী বেসি ছিনতাইকারীরা। এই ঘটনায়ও জড়িত কোনো অপরাধীকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। নগরের সাগরদিঘীর পাড় ও অভিজাত এলাকা হাউজিং এস্টেটে আলোচিত দু’টি ছিনতাইয়ের শিকার হন দুই নারী। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নগরির হাউজিং ইস্টেটে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন মহিলা ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। সিসি টিভি ফুটেজে দেখা যায় তিন মোটরসাইকেলে ৬ জন ছিনতাইকারী ছিনতাইয়ে অংশ নেয়। যা দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়। ওই ঘটনার ৯ দিন পর নগরীর সাগরদিঘির পাড়ে আবারো ছিনতাইয়ের শিকার হন আরেকজন পথচারী মহিলা। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে একটি মোটরসাইকেল যোগে দুইজন ছিনতাইকারী দেশীয় অস্ত্রের মুখে ওই নারীকে মারধরকে ছিনতাই করে। সাগরদিঘীরপাড় ও হাউজিং এস্টেটের ঘটনায় আক্রান্ত মহিলা ভয়ে মামলায় যাননি। আর হাউজিং এস্টেটের ঘটনায় কেবল একজনকে সন্ধিগ্ধ হিসেবে ধরা হয়েছে। বাকি অপরাধিরা এখনো অধরা!
এছাড়াও সবচেয়ে আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে গত বছর। নগরীর দক্ষিণ সুরমার কদমতলী এলাকায় এনা পরিবহন ম্যানাজারকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ১২ লাখ টাকা ছিনিয়ে ছিনতাইকারীরা। কদমতলী এনা পরিবহনের টাকা ছিনতাই ঘটনায় সন্দেহভাজন ৬ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করা হয়, জানিয়েছেন এসএমপির এডিসি মিডিয়া মো. মনজুরুল আলম। তবে এনা পরিবহনের টাকা ছিনতাই ঘটনা ব্যতিত ভুক্তভোগীর পক্ষে বাকি ছিনতাই ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি বলেও জানান তিনি।
পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, রমজান মাস থেকে এখন পর্যন্ত নগর এলাকায় ছিনতাই ঘটনায় ১০টি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৪৯ জন আসামী গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে বেশির ভাগ সন্ধিগ্ধ এবং নিয়মিত অভিযানে আটক। তার মধ্যে ছিছকে ছিনতাইকারীও রয়েছে। কুমারগাওয়ে বিকাশ ব্যবসায়ীর ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও মামলা হয়নি। আসামীও গ্রেফতার নাই।
নগরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাত নামলে সিলেট নগরী যেনো অনিরাপদ হয়ে যায়। শান্তির নগরজুড়ে এখন অশান্তি পয়দা হয়েছে। বিশেষ করে অভিজাত হাউজিং এস্টেট এলাকা, সাগরদিঘীরপাড়, আম্বরখানা-শাহী ঈদগাহ, উপশহর, টিলাগড়, ও বন্দরবাজার, শাহজালাল ব্রীজ, ক্বিনব্রিজ, কাজিরবাজার ব্রিজ, মারকাজ পয়েন্ট, দক্ষিণ সুরমার বিভিন্ন এলাকায়ও রাত নামলেই বাড়ছে ছিনতাই ও চুরি নিত্যদিনের ঘটনা। ভুক্তভোগীদের অনেকে থানা পুলিশে অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পান না। আক্রান্ত হয়েও নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে অনেকে মামলায় যান না। যে কারণে তৎপরতা দেখাতে হয় না পুলিশকেও।
ছিনতাই বাড়ার নেপথ্যে কারণ:
ছিনতাই বাড়ার পেছনে বহুবিধ কারণ দেখছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে একটি ঘটনার যখন প্রতিকার হয় না। তখন অপরাধিরা আস্কারা পায়। মাদক ও জুয়া নিয়ন্ত্রণ না নিতে পারাও আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ এসএমপির।
এছাড়া সিলেট শহরে ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ী ও ব্যাটারি চালিত রিকশা চালকদের বেশিরভাগ বহিরাগত। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের অভিযানে অটোরিকশা বাজেয়াপ্ত হওয়ায় লক্ষাধিক মানুষ কর্ম হারিয়েছে। এরপর থেকেই নগরজুড়ে বেড়েছে অপরাধ অপকর্ম। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকার সংযোগ থাকায় সিলেটে মাদক প্রবেশ সহজ হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর মাদকের দিকে ঝুকছে যুব সমাজ। মাদকের ছুবল থেকে অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে।
কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান:
সিলেটে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে কিশোর গ্যাং। বিভিন্ন এলাকায় ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সংঘর্ষ, মারামারি এমনকি গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা।
এদিকে, ছিনতাইকারীদের তথ্য চেয়ে পুলিশ কমিশনারের গণবিজ্ঞপ্তি জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে, তবে কি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ব্যর্থ! তাছাড়া পুলিশ অপরাধ দমনে সোর্স মানি পেয়ে থাকে। সেটারও যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীতে রাত্রিকালীন পুলিশের প্রতিটি টহলটিমে কিংবা অধস্থন কর্মকর্তারা সোর্স হিসেবে অপরাধীদের ব্যবহার করে থাকেন। বিশেষ করে ছিনতাইকারীদের সোর্স বানিয়ে নেওয়ার কারণে ছিনতাই রুখতে পারছে না পুলিশ। কেননা, সোর্স পুলিশের অবস্থান ছিনতাইকারীদের বলে দিচ্ছে। যে কারণে যে সড়কে টহল নেই, সেখানেই ঘটছে ছিনতাই। আর পুলিশও প্রকৃত ছিনতাইয়ের ঘটনাকে আড়াল করতে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে। অনেক ঘটনাকে পূর্ববিরোধ বলে চালিয়ে দেওয়ার ঘটনা এখন হরহামেশাই ঘটছে।
নগরবাসীর অনেকে বলেন, ধারাবাহিক ছিনতাই সংঘটিত হওয়ার পরও এসব ঘটনার সাথে জড়িত কোনো ছিনতাইকারী গ্রেফতার না হওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে। ছিনতাই ছাড়াও নগরীতে প্রতিনিয়ত ঘটছে চুরি, ডাকাতি, অপহরণসহ হত্যার মতো ঘটনা। যদিও পুলিশ বলছে এসব অপরাধ নির্মুলে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু নাগরিকদের শঙ্কা কাটাতে পারছেনা। দুঃসাহসিক এসব অপরাধকান্ডে সরাসরি জড়িতদের বিরুদ্ধে আশানুরুপ সফল হতে পারছেনা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। যদিও বিগত কয়েকটি অভিযানে শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। যারা চৃরি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ সহ ধর্ষণের মতো অপরাধের সাথে জড়িত রষেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশ কমিশনার মো. আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলন সিলেটের চিহ্নিত ৪৪ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতারের তথ্য জানান। কিন্তু সেই তালিকায়ও সম্প্রতি সংঘটিত ছিনতাইয়ে জড়িতরা রয়েছে কিনা, তা প্রকাশ করেননি। যদিও বিগত ধারাবাহিক অভিযানে ব্যাপকহারে বিভিন্ন অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি সংঘটিত আলোচিত একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনার সাথে জড়িতরা এখন পর্যন্ত অধরাই থেকে যাচ্ছে । যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে অপরাধিদের গ্রেফতারের বিষযে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. মাসুদ রানা বলেন, অপরাধীদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রযেছে। অপরাধীরা একবার গ্রেফতার হয়ে জামিনে বেরিয়ে তাদের অপরাধের কৌশল পরিবর্তন করে ফেলে। যার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সনাক্ত করতে কিছুটা সময় লাগে।
সিলেট নগরীতে এসব অপরাধ ধমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সকলের পারষ্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষক ও উচ্চ আদালতের আইনজীবি শিপন আহমেদ।
তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে সিলেটের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দকে প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে হবে। কেননা বেশিরভাগ অপরাধীরা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক ফায়দা ব্যবহার করে এসব অপরাধ কান্ডে জড়ায়।
স্থানীয়দের মতে, সামাজিক অবক্ষয় ও নজরদারির অভাব এ প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে এসএমপি বলছে, অপরাধ দমনে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত টহল, বিশেষ অভিযান এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। অনেক অপরাধীকে গ্রেফতারও করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পুলিশি তৎপরতা বাড়ালেই হবে না—সামাজিক সচেতনতা, পরিবার ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে টেকসই পরিবর্তন আনা কঠিন হবে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সিলেটকে একটি নিরাপদ নগরীতে পরিণত করবে এসএমপি।