আজ রবিবার, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সুবর্ণ অতীত-বিবর্ণ বর্তমান

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৬, ২০২৪, ০৩:২১ অপরাহ্ণ
সুবর্ণ অতীত-বিবর্ণ বর্তমান

পুরনো দিনের সবকিছু ভাল ছিল, এ রকম একটি মতবাদ বয়স্কদের মধ্যে প্রচলিত। এ যুগের ছেলে মেয়েরা এ কথা মেনে নিতে চায়না সহজে। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের সময়কে পুরনো দিন ধরে নিয়ে ব্যাপারটি আমরা একটি বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি।

প্রথমে শিক্ষার ধরন-ধারণ নিয়ে দেখা যাক। আগের দিনে ব্যাঙের ছাতার মতো এত ইংরেজী মাধ্যম স্কুল ছিল না। মাতৃভাষা ছিল শিক্ষার বাহন। তাই বাংলা ভাষার এত দুর্গতি তখন ছিল না। স্কুলের পাঠ্যক্রমে ইতিহাস ও ভূগোলের মত অত্যাবশ্যক বিষয় অর্ন্তভুক্ত ছিল। যার দরুন সাধারণ মানের ছাত্র ছাত্রীদের ইতিহাস ও ভূগোলের সম্বন্ধে কিছুটা জ্ঞান ছিল। বর্তমানে সমাজ বিদ্যা নামক বিষয়ের গহ্বর বিভিন্ন রকম জ্ঞানভান্ডার দিয়ে ঠাসা। অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা তোতাপাখির মতো এগুলো কোন রকমে মুখস্থ করে পরীক্ষা-সাগর পার হবার জন্য।

সরকারী স্কুল গুলোতে ভাল ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা খুব কম। এর কারণ, নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের ছেলে মেয়েরা প্রধানত এসব স্কুলে ভিড় করে। এদের মধ্যে অনেকের প্রাইভেট টিউশনের খরচ যোগানো কষ্টকর। সাধারণ ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর মত যতœ নিয়ে পড়ানো হয় না। তবে কিছু শিক্ষক এখনো নিজের দায়িত্ববোধ সম্বন্ধে যে সচেতন, এ কথা না বললে অন্যায় হবে। প াশ-প ান্ন বছর পূর্বে শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ববোধের অভাব দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

এ যুগের স্বচ্ছল পরিবারের শিশুদের শৈশব হারিয়ে গেছে অভিভাবকদের উদগ্র বাসনার যাতাকলে। জ্ঞান হবার পর তারা প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে সামিল হয়ে যায়। পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোন বই পড়া অবকাশ বা আগ্রহ তাদের নেই। টিভির আগ্রাসী ভূমিকা এ জন্য অনেকটা দায়ী। মাতৃভাষা হলে বাংলা ভাষার চর্চা অধিকাংশ পরিবারে নেই বিশেষ করে যারা প্রবাসে থাকেন। এর জন্য দায়ী অভিভাবকদের উচ্চাকাক্সক্ষা ও নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা এবং অবহেলা। মুখস্থ বিদ্যার বিনিময়ে আহরিত স্কুল-কলেজের ডিগ্রি এদের ‘শিক্ষিত’ অভিধায় ভূষিত করেছে। এসব প-িতম্মন্য মা-বাবাদের অধিকাংশেরই সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ প্রায় নেই।

তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে বিয়ে উপলক্ষে বই উপহার দেবার প্রচলন ছিল কিন্তু এখন কেউ বই উপহার দেয়ার কথা ভাবে না। কারণ পড়বে কে? অথচ আমাদের অল্প শিক্ষিত মায়েদের মধ্যে বই পড়ার অসীম আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। তবে এ কথা বলতে হবে যে, সেকালে টেলিভিশন ছিল না। এ বোকাবাক্সটি থাকলে হয়তো তাঁদের জীবনধারা অন্যখাতে প্রবাহিত হত।

টেলিভিশন নামক বস্তুটি বর্তমান সমাজে জীবনধারার এক অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বেশী পরিলক্ষিত হয়। এর ভাল দিক কতটি জানা নেই, তবে খারাপ দিকটি সবাইকে প্রভাবিত করছে যেমন মেয়েদের পোশাক। কুরুচিকর বেশবাশ এখন আধুনিকতার অন্য নাম। অধিকাংশ মেয়েরা শাড়ি পরা পছন্দ করে না। শাড়ি পরে চলাফেরা করতে তাদের অসুবিধা হয়। অবশ্য সালোয়ার কামিজ পরা নিয়েও কারো আপত্তি হবার কথা নয়। বিবাহিতা-অবিবাহিতা অনেকেই পরছে। আপত্তিকর হল অনেক মেয়েরা ওড়নাকে গলাবন্ধনী হিসাবে ব্যবহার করে দেহ প্রদর্শন করে। ওড়নার ব্যবহার সম্বন্ধে তারা কি অজ্ঞ? এ কুৎসিত রুচি সম্ভবত টিভি থেকে আহরিত। শরীর দেখাবার জন্য কিছু সংখ্যক মেয়েরা নানা প্রকার কুরুচিকর পোশাক পওে থাকে। এদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানের পৃষ্ঠপোষক বলে ধরে নেয়া যায়। লজ্জা বস্তুটি সম্ভবত এ দেশ থেকে ধীরে ধীরে বিদায় নিতে চলেছে। চলচ্চিত্রের নায়িকা, বিজ্ঞাপনের মডেলরা এসব মেয়েদের আদর্শ বলে মনে হয়।

কবি বলেছেন, ‘মাতৃভাষা ও মাতৃদুগ্ধ সমার্থক’। প্রসঙ্গত, এ কালের কিছু কিছু মা ‘ফিগার মেনটেন’ করার জন্য সন্তানকে স্তন্যপান করাতে অনীহা প্রকাশ করেন। যা হোক, এ যুগের অনেক ছেলেমেয়ে যে মাতৃভাষার প্রতি অনাসক্ত, সে কথা আগে বলেছি। এরা বাংলা ছবি, বাংলা গান পছন্দ করে না। বাংলা গান তাদের কাছে উপহাসের বস্তু, প্যান-প্যানানি বলে মনে করে। অনেকে বাংলা পড়তেও পারে না। এসব গুণাবলী (?) তাদের মা-বাবার কাছে লজ্জার বিষয় নয়। নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতি সম্বন্ধে অজ্ঞ এসব ছেলে মেয়েদের কি ময়ূর পুচ্ছধারী দাঁড়কাক ছাড়া কিছু বলা যায়? এ বিজাতীয় সংস্কৃতির ধারক ও বাহকরা যে আমাদের ভবিষ্যৎ, এ কথা ভাবলে শঙ্কা জাগে।

আগেকার দিনের একান্নবর্তী পরিবার অবলুপ্ত বলে প্রায়ই আফসোস শোনা যায়। সেকালের বাবা, চাচাদের পরিকল্পনাহীন বিশাল পরিবারের ছবি, গল্প, উপন্যাসে আমরা প্রত্যক্ষ করি। বর্তমানে ততটা বড় না হলেও একান্নবর্তী পরিবার একেবারে দুর্লভ নয়। তবে দুর্লভ হবার দিকে যে এগোচ্ছে, সে কথা ধরে নেয়া যায়। আগেকার বিরাট পরিবারের দ্রুমুন্ডের কর্তা একজন ছিলেন, যাঁর মুখের ওপর কথা বলার সাহস কারো ছিল না। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একাধিপত্য অনেক হ্রাস পেয়েছে। তার একাধিক কারণের মধ্যে একটি কারণ সম্ভবত শিক্ষা-দীক্ষায় মেয়েদের প্রভূত অগ্রগতি। তাছাড়া নারী শিক্ষা প্রসারের দরুন মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থসামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নারী-পুরুষের মানসিকতার পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবে ঘটেছে। একান্নবর্তী পরিবার টিকিয়ে রাখতে হলে পরিবারের সদস্যদের যে ত্যাগ, ধৈর্য ও সংযমের প্রয়োজন, সেগুলো ক্রমশ লুপ্তপ্রায় এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বার্থপরতা প্রাধান্য পাচ্ছে কাজে ও কথায়। এসব ক্ষেত্রে লোক দেখানো একান্নবর্তী পরিবারের চেয়ে ভিন্ন হয়ে গিয়ে ভাব-ভালবাসা বজায় রাখা সম্ভব ও শোভনীয় বলে মনে হয়।

সেকালে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ শব্দটি শুনলে পাশ্চাত্য দেশের কথা মনে হত। বয়স্ক মা-বাবাকে যে সংসারের বাইরে বের করে দেয়া যায়, সে কথা বোধ করি কারো কল্পনাতেও ছিল না। বর্তমান যুগে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান এবং এতে এ যুগের স্বার্থপর মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে সৌভাগ্যের কথা যে, এ মানসিকতা উচ্চ-মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারে সীমাবদ্ধ। অবশ্য তাই বলে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত সমাজের সকল বয়স্করা যে পরিবারে খুব কাক্সিক্ষত অথবা শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন, তা বলা যাবে না। তবে এর জন্য একতরফা কাউকে দোষ দেয়া সমীচীন নয়। বিধবারা এখন আর আগের মতো ততটা সামাজিক অবিচারের শিকার নন। হিন্দু মেয়েদের পক্ষপাতদুষ্ট শাস্ত্রীয় বিধান (?) অমান্য করে আমিষ আহার করছেন, রঙ্গিন কাপড় পরছেন, কমবয়সী বিধবাদের বিয়েও হচ্ছে, মুসলমান পরিবারেও বিধবাদের ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেকালের তুলনায় এখন বিবাহ-বিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।

এর পিছনে বিভিন্ন কারণ থাকলেও মূলত নারীদের আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি প্রধান কারণ বলে মনে হয়। পারিবারিক অত্যাচার ও নিষ্পেষণের প্রতিবাদে অনেক মহিলা সংসার ভেঙ্গে বেরিয়ে আসেন। তবে বিবাহ-বিচ্ছেদের ঘটনা প্রধানত উচ্চবিত্ত শিক্ষিত শহুরে পরিবারেই বেশী। সামাজিক লজ্জার ভয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা অত্যাচারিত হলে বিবাহ-বিচ্ছেদের পথে এগোতে চান না বরং অত্যাচার অসহনীয় হয়ে উঠলে অনেক ক্ষেত্রে আত্মাহুতিকে সমস্যার সমাধান বলে মনে করেন।

পরিবর্তন জীবনের ধর্ম। ৫০ বছর আগে যা ছিল এখন তা সেকেলের এখন যা আধুনিক, প াশ বছর পর তাই সেকেলে হয়ে যাবে। যুগের ধর্ম আমাদের স্বীকার করে নিতে হয়, সেটা ভাল বা মন্দ যাই হোক। তবে কোন কালের সবকিছু ভাল নয়, হতে পারে না। প্রসঙ্গত, নিবন্ধের পরিসর বৃদ্ধির আশঙ্কায় কিছু দিক অনালোচিত রয়েই গেল।

লেখক – সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০