সিলেট নগরীর রায়নগরে একই পরিবারের তিনজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা অভিযোগে ভূমি বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিনের জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, মামলা প্রত্যাহারের জন্য ধারাবাহিক হুমকি এবং আদালতে চলমান মামলার নথিপত্রকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
গত ১২ আগস্ট নগরের কোতোয়ালি মডেল থানাধীন রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় নিজ বাসায় খুন হন এম এ সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম। ঘটনার সময় পরিবারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা যুক্তরাজ্যে ছিলেন।
ঘটনার পর দেশে ফিরে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন সেলিনা সুলতানা।
অভিযোগে তিনি দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ওই বিরোধের যোগসূত্র থাকতে পারে।
অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯৭ সালে সেলিনা সুলতানা ও তার বাবা এম এ সাত্তার পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি, সিলেটের কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে ভোগদখল করে আসছিলেন।
অভিযোগকারীর দাবি, ২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম ওই জমিসহ পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির প্রায় ৮০ শতক জমি ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের নামে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিলের মাধ্যমে নেওয়ার দাবি করেন এবং পরবর্তী সময়ে নামজারি করেন।
এ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে তার বাবা এম এ সাত্তার আদালতে স্বত্ব মামলা করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, মামলা দায়েরের পর এম এ সাত্তারকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়। এ নিয়ে সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের পৈতৃক বাসায় গিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের সামনে এম এ সাত্তার ও মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে সিরাজুল ইসলামের বিরোধের ঘটনা ঘটে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। সেখানে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া এবং তৌহিদুল ইসলামকে মারধরের অভিযোগ করা হয়। এ ঘটনায় পরবর্তী সময়ে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ভূমি-সংক্রান্ত একাধিক মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। আগামী ১৯ আগস্টও এ-সংক্রান্ত একটি মামলার ধার্য তারিখ রয়েছে।
সর্বশেষ ২৮ জুলাই একটি ভূমি-সংক্রান্ত মামলার শুনানি চলাকালে এম এ সাত্তারের নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। ৩০ জুলাই আদালতে উপস্থিত হলে এম এ সাত্তারকেও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবারও হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরই ১২ আগস্ট রায়নগরের বাসায় তিনজন হত্যার শিকার হন।
অভিযোগে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এম এ সাত্তারের চলমান মামলা থেকে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিলটি সরিয়ে নেওয়া এবং ভূমি-সংক্রান্ত নথিপত্র সরানোর উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। হত্যার পর বাসা থেকে ভূমি ও মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্র, জিডির কপি এবং দলিলপত্র নিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন এসএমপির কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মোহাম্মদ মাইনুল জাকির। তিনি বলেন, ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় নিহতের মেয়ে বাদী হয়ে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে আসামি অজ্ঞাত উল্লেখ করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, কারা এতে জড়িত এবং বাসা থেকে কোনো নথিপত্র নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে বলে জানান তিনি।
পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া কাগজপত্র ও দলিলাদি উদ্ধারের দাবি জানানো হয়েছে।
গত বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার মিতালী ১১১ নম্বর নিকুঞ্জ ভিলা নামের বাসার দ্বিতীয় তলার দুটি কক্ষে তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন-সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার আকাখাজানা গ্রামের মৃত আবরু মিয়ার ছেলে এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের মিতালী ১১১, নিকুঞ্জ ভিলার বাসিন্দা এম এ সাত্তার (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং তাঁদের বাসার গৃহকর্মী তাহমিনা (১৫)। তাহমিনা নগরের জল্লারপাড় এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
নিহত আব্দুস সাত্তার সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ও সিলেট চেম্বারের পরিচালক ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজ বাসায় স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছিলেন। তাঁদের দেখাশোনা করতেন গৃহকর্মী তাহমিনা। তাঁদের চার সন্তান যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।
ওইদিন বিকেলে ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় বাবুল মিয়া (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। আটক বাবুল মিয়া নগরের রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মৃত নুর মিয়া ও আনোয়ারা বেগম দম্পতির ছেলে। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলায়। পুলিশ আপাতত বাবুল মিয়াকেই তিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত হিসেবে দেখছে।
পেশায় কসাই বাবুল মিয়া পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি বাসার গৃহকর্মী তাহমিনাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ও অপমানের পর বুধবার সকালে ওই বাসায় গিয়ে তাহমিনাকে ছুরিকাঘাত করেন। পরে তাঁর চিৎকার শুনে বাসার মালিকের স্ত্রী রান্নাঘর থেকে এগিয়ে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর বৃদ্ধ এম এ সাত্তারের সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এ সময় বাবুল মিয়াও আহত হন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর বাসার ওয়ারড্রোব তছনছ করে মেঝেতে দলিলের টুকরো ফেলে রাখার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। হত্যাকাণ্ডের পর গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও দলিলাদি খোয়া গেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
অনেকের ধারণা, এই হত্যাকাণ্ডে কেবল বাবুল মিয়াকে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এর নেপথ্যে আরও কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নিহত এম এ সাত্তার বিপুল সম্পত্তির মালিক ছিলেন এবং তাঁর অধিকাংশ উত্তরাধিকারী বিদেশে বসবাস করেন বলে জানা গেছে। ফলে সম্পত্তি-সংক্রান্ত কোনো বিরোধ হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
এ ছাড়া বাবুল মিয়া ও গৃহকর্মী তাহমিনার বয়সের পার্থক্য নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব প্রশ্ন বা ধারণার কোনোটি এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর নেপথ্যে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বাদ আসর নগরের ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহ ময়দানে এম এ সাত্তার ও তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাদের লাশ নগরের নয়াসড়ক হযরত মানিকপীর (রহ.) মাজার-সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়। এছাড়া গৃহকর্মী তাহমিনার জানাজা ও দাফন বৃহস্পতিবারই সুনামগঞ্জে তাঁর গ্রামের বাড়িতে সম্পন্ন হয়।