সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) এলাকায় এবারের কোরবানির পশুর হাট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গত বছরের তুলনায় অস্থায়ী পশুর হাটের সংখ্যা কমার পাশাপাশি কমেছে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয়ও।
বিশেষ করে গত বছর সর্বোচ্চ মূল্যে ইজারা যাওয়া মাছিমপুরস্থ কয়েদীর মাঠ সংলগ্ন পশুর হাটটি এবার ইজারার আওতায় না আনা হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালে সিসিক এলাকায় মোট ৭টি অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা দেওয়া হলেও চলতি ২০২৬ সালে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫টি হাটের। ফলে হাট কমার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সিসিকের রাজস্ব খাতে।
গত বছর ৭টি হাট থেকে সিসিকের মোট ইজারা আয় হয়েছিল ২০ লাখ ৩ হাজার ৩০০ টাকা। বিপরীতে এবার ৫টি হাট থেকে মূল ইজারা বাবদ আয় হয়েছে ১৪ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে সিসিকের সরাসরি রাজস্ব আয় কমেছে ৫ লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টাকা।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে মাছিমপুরস্থ কয়েদীর মাঠ (পার্শ্বস্থ) খালি জায়গার পশুর হাটটি। ২০২৫ সালে এই একক হাট থেকেই সিসিক সর্বোচ্চ ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকা রাজস্ব পেয়েছিল। কিন্তু এবার হাটটি ইজারার তালিকায়ই রাখা হয়নি। সর্বোচ্চ রাজস্ব প্রদানকারী এই হাট হঠাৎ বাদ পড়ার কারণ নিয়ে খোদ সিটি করপোরেশনের ভেতরেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গতবারের কয়েদির মাঠের ইজারাদারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অংশীদার বলেন, এবার কাজিরবাজারের একাংশ ইজারা পেয়েছে, সরকার দলের রাজনীতির সাথে যুক্ত একটি পক্ষ। গতবারের সর্ব্বোচ্চ রাজস্ব দেওয়া হাটটি কী, তাদের সুবিধা দেওয়ার জন্য উধাও করা হয়েছে, সে প্রশ্নটি সামনে আসছে।
এদিকে, চলতি বছর নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ‘এস ফ্রন্ট মাঠ, ‘তেতলী উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান অংশ ব্যতিত’ নামের একটি পশুর হাট। তবে মাত্র ৫০ হাজার টাকায় ইজারা হওয়া এই হাট রাজস্ব ঘাটতি পূরণে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।
হাটভিত্তিক ইজারামূল্যের তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, কিছু হাটে ইজারামূল্য বেড়েছে, আবার কয়েকটিতে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
এবার ইজারা হওয়া আব্দুল লতিফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন খালি জায়গার হাটটি গত বছর ২৫ হাজার টাকায় ইজারা হলেও এবার হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ হাজার টাকা। নতুন টুকের বাজার (তেমুখী পয়েন্ট) সংলগ্ন হাটের ইজারা ১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। বৃদ্ধি ২০ হাজার টাকা।
এদিকে শাহপরাণ (রহ.) বাজার সংলগ্ন হাটের ইজারামূল্য ৮০ হাজার টাকা থেকে লাফিয়ে ১১ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ টাকায় পৌঁছেছে। বৃদ্ধি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬০০ টাকা। দক্ষিণ সুরমা কেন্দ্রীয় ট্রাক টার্মিনালের হাটটি গতবার ৪ লাখ ২ হাজার ৮০০ টাকায় ইজারা হলেও এবার নেমে এসেছে মাত্র ১ লাখ টাকায়। কমেছে ৩ লাখ ২ হাজার ৮০০ টাকা।
এছাড়া মাছিমপুরস্থ কয়েদীর মাঠের হাটটি গত বছর ১২ লাখ ৮০ হাজার টাকায় ইজারা হলেও এবার ইজারাই দেওয়া হয়নি। মেজরটিলা বাজার সংলগ্ন হাটটি গত বছর ৫০ হাজার টাকায় ইজারা হলেও এবার বাদ দেওয়া হয়েছে। টিলাগড় পয়েন্ট সংলগ্ন হাটটি গতবার ১ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকায় ইজারা হলেও এবার তালিকায় নেই।
নতুন সংযুক্ত এস ফ্রন্ট মাঠ, তেমুখী হাটটি এবার প্রথমবারের মতো ৫০ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এবার ইজারাদারদের কাছ থেকে মূল ইজারার পাশাপাশি ১০ শতাংশ আয়কর, ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১ লাখ থেকে দেড় টাকা পরিচ্ছন্নতা ফি আদায় করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে শাহপরাণ বাজার সংলগ্ন হাটের ইজারাদার মোহাম্মদ এনামুল হক কুটি মূল ইজারা মূল্য ১১ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ টাকার বিপরীতে ভ্যাট, ট্যাক্স ও অন্যান্য ফি মিলিয়ে মোট ১৫ লাখ ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা জমা দিয়েছেন।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, গতবারের সবচেয়ে লাভজনক হাটটি কেন এবার ইজারার আওতায় আনা হলো না এবং হাট সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ ছিল। তাদের মতে, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা থাকলে সিসিক আরও বেশি রাজস্ব আয় করতে পারতো।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজা-ই-রাফিন সরকার বলেন, পশুর কোরবানির পশুর হাট ইজারার তালিকা জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া হয়। গতবার যেখানে ৭টি হাট ইজারা দেওয়া হয়, এবার জেলা প্রশাসন থেকে ৫টি হাটের তালিকা দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী ইজারা সম্পন্ন হয়। যেহেতু হাট ইজারার তালিকা প্রণয়নের প্রশাসনিক ক্ষমতা, জেলা প্রশাসনের তাই আমাদের কিছু করার নেই। হাট যেহেতু কমেছে, রাজস্বও কমেছে।
সূত্র: সিলেটের মানচিত্র