পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ১০ জিলহজ তথা আজ ২৮ মে বৃহস্পতিবার উদযাপিত হবে। এদিন ঈদের সালাত আদায়ের পর পশু কুরবানির মাধ্যমে গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ত্যাগের মহিমায় ঈদটি পালিত হবে।
এই দিনটি শুধু আনন্দ-উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য মানবজীবনে ত্যাগ, আত্মনিবেদন ও আল্লাহভীতির এক অনন্য শিক্ষা বহন করে।
প্রতিবারের ন্যায় এবারও সিলেটে ঈদের প্রধান জামাত ঐতিহাসিক শাহি ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া সিলেট নগরীর প্রায় প্রতিটি পাড়া মহল্লার মসজিদগুলোতেও ঈদ জামাতের আয়োজন করা হয়।
ঈদের পর ৩ দিন পর্যন্ত পশু কুরবানি বৈধ বলে হাদিসে নববীতে উল্লেখ রয়েছে।
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আইয়ামে তাশরিকের (ঈদের পরের তিন দিন) ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রতিটি দিনই জবাইয়ের দিন।”-মুসনাদ আহমাদ।
তবে কোরবানি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হওয়ায় বিনা ওজরে (অপারগতা ব্যতীত) তা প্রথম দিন সম্পন্ন করাই সবচেয়ে শ্রেয়
ঈদুল আজহার ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও শিক্ষণীয়। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানি করার যে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেছিলেন, তা মানব ইতিহাসে ত্যাগের এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
আল্লাহর নির্দেশে তিনি মক্কার নির্জন মরুভূমিতে এই কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। তাঁর অবিচল ঈমান ও আত্মসমর্পণের প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ তায়ালা হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানি কবুল করেন।
এ ঘটনাই পরবর্তীতে মুসলিম উম্মাহর জন্য কুরবানির বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আজও সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে পালিত হচ্ছে।
কুরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানুষের অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আত্মশুদ্ধির এক মহান অনুশীলন। যাদের ওপর জাকাত ফরজ, তাদের ওপর কুরবানি ওয়াজিব- এটি ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কুরবানির মাধ্যমে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই নয়, বরং সমাজে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার চর্চাও হয়।
কুরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হয় এবং মানবিক বন্ধন আরও গভীর হয়।
ঈদুল আজহার প্রকৃত শিক্ষা নিহিত রয়েছে আত্মত্যাগের দর্শনে। কুরবানি শুধু পশু জবাই করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা পশুত্ব- যেমন লোভ, হিংসা, অহংকার, ক্রোধ ও স্বার্থপরতা এসব কুপ্রবৃত্তিকে দমন করাই এর আসল উদ্দেশ্য।
একজন সত্যিকারের কুরবানিদাতা কেবল পশুর গলায় ছুরি চালান না, তিনি নিজের অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তির বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করেন। এই আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়াই কুরবানির মূল শিক্ষা, যা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য কল্যাণকর।
বর্তমান সমাজে অনেক মানুষ এখনও কুরবানি দেওয়ার সামর্থ্য অর্জন করতে পারেননি। তাই ঈদের এই আনন্দময় দিনগুলোতে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
অযথা বিত্ত প্রদর্শন বা প্রতিযোগিতার পরিবর্তে কুরবানির প্রকৃত চেতনা ধারণ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এতে করে ঈদের আনন্দ সবার মাঝে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে।
এ ছাড়া ইসলাম পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। কুরবানির পর সৃষ্ট বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ ও ব্যবস্থাপনা করা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। পরিবেশ দূষণ রোধ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ বিষয়ে সচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
যত্রতত্র বর্জ্য ফেলে কুরবানির পবিত্রতা নষ্ট করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ত্যাগ, সংযম ও ভ্রাতৃত্ববোধের মহিমায় উদ্ভাসিত হোক আমাদের ঈদুল আজহা। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে উঠুক।