টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলে সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি বিস্তার লাভ করছে। এরই মধ্যে প্লাবিত হয়েছে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ সাত জেলার ৫৮টি উপজেলা।পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় পৌনে ৩ লাখ পরিবার। বন্যা, ঢল ও পাহাড়ধসে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। এ পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢল। বন্যা পুর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে আরও সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ ১২ জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, অতি ভারী বৃষ্টিতে দেশের ১২ জেলার বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে। প্লাবিত হতে পারে নতুন নতুন এলাকা।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সাঙ্গু নদী (বান্দরবান) ও দোহাজারী (চট্টগ্রাম), কুশিয়ারা নদী মারকুলি (সুনামগঞ্জ) ও ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট), সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) স্টেশনে পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে সোমবার ও মঙ্গলবার দুই দিনে ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব অথবা কিছুটা অবনতি হতে পারে। তবে দ্রুতই বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরী এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলসমূহে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
৬ বিভাগে ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা : দেশের ছয়টি বিভাগে ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. হাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সোমবার দুপুর পর্যন্ত দেশের রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়াবিদ মো. হাফিজুর রহমান বলেন, যদি কোনো স্থানে ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, তবে তাকে ভারী বৃষ্টি বলে। আর এর বেশি হলে তা অতি ভারী বৃষ্টি। মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণেই এত বৃষ্টি হচ্ছে। তবে শুরুটা হয়েছিল নিম্নচাপ দিয়ে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ- এই সাত জেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় এরই মধ্যে ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ। বন্যাকবলিত মানুষের জন্য সরকার চাল, নগদ অর্থ ও শুকনো খাবার বিতরণ শুরু করেছে।
এদিকে ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহসহ ১২ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র। কোথাও কোথাও পানি কমলেও অনেক এলাকায় এখনও দুর্ভোগ কাটেনি। দুর্গত মানুষের প্রধান সংকট হয়ে উঠেছে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উজানে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
পানি বাড়ছে সুরমায় :
সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টিপাত না হলেও পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে। জেলার দুটি পয়েন্টে পানি ১০ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এখনও কোনো নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেনি।
সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ সীমান্তে কুশিয়ারা নদীর পানি দিরাই উপজেলার মার্কুলি পয়েন্টে বিপদসীমার ১৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ৩৭ মিলিমিটার, ছাতকে ৪৭ মিলিমিটার এবং তাহিরপুরে ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী দুই দিন ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১ হাজার ৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র, ৪৯২টি নৌযান এবং ১ হাজার ৫৬টি মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
মৌলভীবাজারে পরিস্থিতির উন্নতি:
মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। মনু, ধলাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর পানি এখন বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কমলগঞ্জ ও রাজনগরের কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢোকা পানি নামতে শুরু করেছে। অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়িতে ফিরেছেন।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এ পর্যন্ত ৯০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে নিচু এলাকায় জমে থাকা পানি পুরোপুরি নামতে সময় লাগবে।