বর্ষার পানি, সবুজ বন আর নৌকার দোলায় প্রকৃতির এক অন্য রকম রূপে সেজেছে দেশের একমাত্র স্বীকৃত সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল।
পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে সিলেটের এই প্রাকৃতিক জলাবনে নেমেছে পর্যটকদের ঢল।
ঈদের পরদিন শুক্রবার (২৯ মে) দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও ভ্রমণপ্রেমীরা ছুটে আসছেন প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যে ঘেরা রাতারগুলে।ছবি
সিলেট নগর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে অবস্থিত রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট বর্ষা মৌসুমে যেন প্রাণ ফিরে পায়।
বছরের অধিকাংশ সময় বনাঞ্চলের গাছপালা পানির নিচে ডুবে থাকে। আর সেই পানির ভেতর দিয়ে ছোট ছোট নৌকায় ভেসে বন ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।
এবারের ঈদেও সেই আকর্ষণ উপভোগ করতে হাজারো মানুষ ভিড় করছেন এই জলাবনে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঘাটজুড়ে নৌকার সারি, পর্যটকদের ব্যস্ততা আর চারদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ।
কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন, আবার কেউ নৌকার ওপর বসেই উপভোগ করছেন বনের নীরব সৌন্দর্য।
ঢাকা থেকে ঘুরতে আসা ইফতেখার ইশরাক বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাতারগুলের অনেক ছবি দেখেছি। কিন্তু বাস্তবে এসে মনে হচ্ছে ছবির চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর। পানির ভেতর গাছের সারি আর নৌকা ভ্রমণের অনুভূতি সত্যিই অসাধারণ।’
ফেনী থেকে আসা ব্যবসায়ী আব্দুল আওয়াল বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য প্রকৃতির কাছাকাছি কোনো জায়গায় আসতে চেয়েছিলাম। রাতারগুল আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছে। এখানে এক ধরনের প্রশান্তি কাজ করে।’
স্থানীয় নৌকার মাঝি মদরিছ আলী বলেন, ‘ঈদ মৌসুমকে কেন্দ্র করে তাদের ব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পর্যটক বহনে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ঈদের ছুটিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ আসে। এতে আমাদের আয়ও ভালো হয়।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী বিল্লাল আহমদ বলেন, ‘পর্যটকদের আগমনে জমে উঠেছে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। খাবারের দোকান, ছোট হোটেল, চায়ের স্টল, পার্কিং ও নৌকা ভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে বাড়ছে আয়। এতে স্থানীয়দের জীবন-জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ সূত্র জানায়, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে। নৌকা ভ্রমণের সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা কোনো ধরনের হয়রানি ঠেকাতে নিয়মিত তদারকি চলছে।
সিলেট ট্যুরিস্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে রাতারগুলসহ সিলেটের সব পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম হচ্ছে। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে।’
প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, বর্ষাকালই রাতারগুল ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। কারণ এ সময় পুরো বন পানিতে ডুবে এক স্বপ্নময় পরিবেশ তৈরি করে। পানির ওপর গাছের প্রতিবিম্ব, পাখির ডাক আর হালকা বাতাস মিলিয়ে যেন এক অন্য জগতের অনুভূতি তৈরি হয়।
তবে পর্যটকদের অসচেতন আচরণ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে পরিবেশবাদীদের। অনেকেই বনের ভেতরে প্লাস্টিক ও খাবারের প্যাকেট ফেলে পরিবেশ দূষণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাতারগুলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে পর্যটকদের আরও সচেতন হতে হবে।
পরিবেশকর্মী তাইনুল ইসলাম বলেন, ‘রাতারগুল শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। তাই এখানে ঘুরতে এসে পরিবেশের ক্ষতি হয়-এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়।’
ঈদুল আজহার ছুটিতে রাতারগুলে পর্যটকদের এমন প্রাণচাঞ্চল্য সিলেটের পর্যটন খাতেও নতুন গতি এনেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা স্বস্তি আর আনন্দ খুঁজতেই প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করছেন এই জলাবনে।
সবুজ বন, শান্ত জলরাশি আর নৌকার দোলায় রাতারগুল এখন যেন ঈদের আনন্দে ভ্রমণপিপাসুদের এক টুকরো স্বর্গরাজ্য- এমনটি মনে করছেন এখানে আসা পর্যটকরা।
এদিকে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে কেবল রাতারগুল নয়, সিলেটের সাদাপাথর, বিছনাকান্দি, প্রকৃতি কন্যা জাফলং, পান্থুমাই ঝর্ণা, উৎমা ছড়া, মৌলভীবাজারের মাধবপুর, সিলেটের চা বাগানসহ শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.) মাজারেও ঘুরতে আসছেন পর্যটকরা।