সরকার দেশের গ্রামগুলোতে আধুনিক নগরসুবিধা সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। অথচ সিলেট নগরীর নতুন ১৫ ওয়ার্ডে শহরের ন্যূনতম সুবিধাটুকু পর্যন্ত নেই।সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) ১৫টি নতুন ওয়ার্ডে নেই পাকা রাস্তা, ড্রেনেজব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, সড়কবাতি। যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, জলাবদ্ধতা আর মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ এলাকার বাসিন্দারা।
৪০ নম্বর ওয়ার্ডের আলমপুর থেকে ছিটা গোটাটিকর গেছে একটি কাঁচা সড়ক। এবড়োখেবড়ো, স্থানে স্থানে কাদাজল জমে আছে। হেঁটে চলাচলেরও জো নেই। দেখে মনে হতে কোনো অজপাড়াগাঁয়ের সড়ক এটি।
ছিটা গোটাটিকর এলাকার বাসিন্দা, পল্লি চিকিৎসক কৃষ্ণমণি বিশ্বাস আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রায় দুই বছর আগে আমাদের এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় এসেছে। তার বহু আগে থেকেই একেবারে নগরলাগোয়া এলাকা এটি। কিন্তু এখানে কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি।’
প্রায় একই রকম অবস্থা বাকি ১৪ ওয়ার্ডের। ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের খাদিমপাড়ার এলাকার বাসিন্দা আজমল হোসেন বলেন, ‘আমরা কোনো সুবিধা তো পাই না। উল্টো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আগে জন্ম-মৃত্যুর সনদ আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পেতাম। কিন্তু গত দুই বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদ নেই, আবার আমাদের ওয়ার্ডে কাউন্সিলরও নেই। ফলে কোনো জন্ম-মৃত্যুর সনদ দেয়া হচ্ছে না। জরুরি প্রয়োজনেও এসব কেউ তুলতে পারছেন না।’
২৬ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার সিলেট সিটি করপোরেশনের আয়তন বাড়িয়ে ২০২১ সালে ১৭৯ বর্গকিলোমিটার হয়। এ সময় নগরের ২৭টি ওয়ার্ড বেড়ে ৪২টিতে পরিণত হয়। এতে সিলেট সদর উপজেলার টুকেরবাজার, খাদিমপাড়া, খাদিমনগর ও টুলটিকর ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বরইকান্দি, কুচাই ও তেতলি ইউনিয়ন সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নতুন ১৫টি ওয়ার্ডে ৪টি আঞ্চলিক অফিস স্থাপন করা হলেও এখন পর্যন্ত এসব এলাকায় নেই সিটি করপোরেশনের কোনো কার্যক্রম।
এমন পরিস্থিতিতে দুয়ারে এসেছে সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এ নির্বাচনে নতুন ওয়ার্ডগুলোর উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। নতুন এই ওয়ার্ডগুলোর ভোটাররা এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন বলেও মনে করা হচ্ছে।
সিটি নির্বাচনের প্রচারেও উঠে এসেছে নতুন ওয়ার্ডগুলোর উন্নয়নের বিষয়টি। মেয়র প্রার্থীদের প্রায় সবাই নতুন ওয়ার্ডের ভোটারদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সিসিকের ৪২টি ওয়ার্ডে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৬০৫ জন। এর মধ্যে নতুন ১৫টি ওয়ার্ডে ভোটার রয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৫২৯ জন।
সিলেটে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে সুষম উন্নয়ন করব। ওয়ার্ডভিত্তিক আলাদা উন্নয়ন পরিকল্পনা করব। ফলে কোনো ওয়ার্ডই উন্নয়নবঞ্চিত থাকবে না।’
সিলেটের মেয়র ও বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘নতুন ওয়ার্ডগুলোর জন্য আমরা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রণয়ন করে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দিই। এটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়েও অনুমোদিত হয়েছে। এখন একনেকে ওঠার অপেক্ষায় আছে। এই প্রকল্পটি পাস হলে বর্ধিত এলাকাগুলো আর উন্নয়নবঞ্চিত থাকবে না।’
তবে বর্ধিত এলাকায় পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রয়োজন উল্লেখ করে লিডিং ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের প্রধান স্থপতি রাজন দাস বলেন, বর্ধিত এলাকাগুলোতে এখনো সেভাবে নগরায়ণ হয়নি। ফলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে ওই এলাকাগুলোতে যাতে যত্রতত্র বহুতল ভবন গড়ে না ওঠে। খোলা মাঠ, জলাশয় যাতে ভরাট করা না হয়। প্রশস্ত সড়ক ও পর্যাপ্ত ড্রেনেজব্যবস্থা থাকাও জরুরি। বহুতল ভবন নির্মাণে যাতে বিল্ডিং কোড মানা হয়, সে বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সব মিলিয়ে উন্নয়ন করতে হবে পরিকল্পিতভাবে।