মূল রিপোর্ট: সিলেটের মানচিত্র
সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে ‘প্লাস-মাইনাস’ লড়াই শুরু হয়েছে। এই আসনে ভোটের সঙ্গে জোটের হিসাব মিলাতে পারছেন না হেভিওয়েট তিন প্রার্থী। তারা হলেন-বিএনপির জোটের জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবাদুল্লাহ ফারুক, বিএনপির বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশিদ-চাকসু মামুন ও জামায়াতের প্রার্থী হাফিজ মাওলানা আনওয়ার হোসাইন খান। এদের কারো সঙ্গে ভোট থাকলেও দল নেই, কারো সঙ্গে জোট থাকলেও তৃণমূল বিএনপির ভোট নেই। জোটে থাকলে জামায়াতের শক্তি বাড়বে, কিন্তু জোট ভেঙে গেলে এ আসনে জামায়াতকে ‘প্লাস থেকে মাইনাস‘ লড়াইয়ে নেমে যেতে হবে। সব মিলিয়ে সিলেট-৫ আসনে ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে।
স্থানীয় রাজনৈতিক দলের একাধিক সূত্র জানায়, উবাদুল্লাহ ফারুক বিএনপির জোটের মনোনীত প্রার্থী হলেও চাকসু মামুন আসনটিতে তার পথের কাঁটা। তিনি মাওলানা ফারুকের ভোট ব্যাংক ভেঙে দিতে পারেন। এতে দিনশেষে বেকায়দায় পড়ে যেতে পারেন মাওলানা ফারুক। ফারুক-চাকসু মামুনের মধ্যে দ্বন্দ্বটি জিইয়ে রেখে সুযোগ নিতে চায় জামায়াত। এ দুজনের লড়াইয়ে মাওলানা ফারুক ও চাকসু মামুনের ভরাডুবি ঘটিয়ে জয়ী হতে চান জামায়াতের আনওয়ার হোসাইন।
স্থানীয় একাধিক দলীয় সূত্র জানায়, সিলেট-৫ আসনে বিএনপির জোটের মনোনীত প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবাদুল্লাহ ফারুক এই মুহুর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও শক্তিশালী একজন হেভিওয়েট প্রার্থী। কানাইঘাট-জকিগঞ্জের অধিকাংশ মানুষ ধর্মপ্রাণ ও আলেমউলামা নির্ভর। সে হিসেবে প্রাজ্ঞবান আলেম হিসেবে মাওলানা উবাদুল্লাহ ফারুক-এর বিজয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। এছাড়াও বিএনপি মনোনীত জোটের প্রার্থী হওয়ায় মাওলানা উবাদুল্লাহ ফারুকের হিসাব ‘প্লাস’ রয়েছে। তার সঙ্গে উপজেলা বিএনপির নেতারাও প্রচার-প্রচারণায় আছেন। আলেম অধ্যুষিত এলাকা হিসেবেও প্রখ্যাত এ আলেম মাওলানা উবাদুল্লাহ সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন বলেই জানা গেছে।
তৃণমূল বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক প্রথম সহ সভাপতি মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) সিলেট-৫ আসনে বিএনপির একজন প্রার্থী হিসেবে দীর্ঘদিন গণসংযোগ, উন্নয়ন ও সামাজিক কাজ করে আসছিলেন। বিএনপি নেতা হিসেবে তিনি এলাকায় বেশ জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তৃণমূল বিএনপিতে তার শক্ত অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা আছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। সেই থেকে তিনি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন। জোটের কারণে দলের মনোনয়ন না পাওয়ায় তিনি এ আসনে এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী। মূলত, তৃণমূলে নিজের ভোট ব্যাংক থাকায় তিনি দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। এখনও ওই নির্বাচনী এলাকার অনেক বিএনপি নেতা চাকসু মামুনের সঙ্গেই আছেন। অতীতে আসনটিতে অনেক স্বতন্ত্রী প্রার্থী জয়ী হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। যে কারণে, জোটে গেলেও ভোটে যদি তৃণমূল বিএনপি ফারুকের সঙ্গে না যায়, তবে চাকসু মামুনের জয়ের অপার সম্ভাবনা আছে।
জামায়াতের জোটের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সিলেট-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হাফিজ মাওলানা আনওয়ার হোসাইন খান। তিনি জামায়াতের ১১ দলীয় ইসলামী জোটের প্রার্থী। ২০০১ সালে কানাইঘাটের এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন জামায়াত প্রার্থী মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী। সেই হিসেবে আসনটিকে জামায়াতের ঘাঁটিও বলা হয়। এছাড়াও আনওয়ার হোসাইন সিলেট জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এলাকার মানুষের সুখে-দুখে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। জামায়াত এবার আসনটিতে জোটে থেকে নির্বাচন করলে আনওয়ার হোসাইন এগিয়ে যেতে পারেন।
শিক্ষাক্ষেত্রেও আনোয়ার হোসাইনের রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। প্রায় এক দশক মৌলভীবাজারের শাহ মোস্তফা একাডেমির প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব্ পালন করেন। তিনি ছিলেন সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহজালাল জামেয়া মাদ্রাসার শিক্ষক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, মেধাবৃত্তি প্রদান ও শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে বিভিন্ন কারণে শিক্ষা অঙ্গনে তিনি একজন গ্রহণযোগ্য ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, আমজনতার ভোটের ওপর ভরসা করেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন চাকসু মামুন। তিনি বিশ^াস করেন, বিএনপি ভোট না দিলেও আমজনতা তাকে ভোট দিয়ে জয়ী করবে। এছাড়াও চাকসু মামুন এখনও বিশ^াস করেন, তৃণমূল বিএনপি তাকে ভোট দিবে। কিন্তু দলের জোটগত কৌশলে যদি বিএনপির সকল ভোটার মাওলানা ফারুকমুখী হয়, তবে চাকসু মামুনের ভরাডুবি ঘটবে। বিএনপি ও জোটের ভোটে আলেম-উলামার এলাকায় এমপি হতে পারেন মাওলানা ফারুক। তবে বিএনপির ভোটাররা ফারুকমুখী না হলে চাকসু মামুন জয়ী হতে পারেন।
বিএনপি সমমনা জোটের মনোনীত প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবাদুল্লাহ ফারুক বলেন, বিএনপি সমমনা জোটের পক্ষ থেকে সিলেট-৫ আসনে আমাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনী আচরণ বিধি মেনে তিনি বিএনপি সহ জোটের নেতাকর্মীদের সাথে এবং জকিগঞ্জ-কানাইঘাটের সর্বস্থরের ভোটারদের সাথে মতবিনিময়, উঠান বৈঠক, সভা করে যাচ্ছি। যেখানে যাচ্ছি মানুষের অকুন্ঠ সমর্থন ও ভালবাসা পাচ্ছি।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা মামুনুর রশিদ-চাকসু মামুন বলেন, আমি এলাকায় আছি দীর্ঘদিন ধরে। মানুষের পাশে আছি। আর তারাই আমাকে নির্বাছন করার উৎসাহ যুগিয়েছেন। আমি তাদের প্রার্থী। একারনে একটি দলে থেকেও আমাকে দল ছাড়তে হয়েছে। আমি নির্বাচন করব, নির্বাচন না করার কোনো সুযোগ নেই।’
সিলেট-৫ আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী মাওলানা হাফিজ আনওয়ার হোসাইন খান বলেন, জকিগঞ্জ-কানাইঘাট হচ্ছে ইসলামপন্থীদের একটি উর্বর আসন। এখান থেকে সময়ে সময়ে অনেক আলেম নির্বাচিত হয়েছেন। ইনশাআল্লাহ, আগামী নির্বাচনেও এর ব্যতিক্রম হবে না।