আট মাস বয়সী একটি শিশুকে নিয়ে শুক্রবার রাতে সিলেটের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছিলেন বাবা-মা। শিশুটির শরীর তখন হামে আক্রান্ত, শ্বাসকষ্টে কাহিল। চিকিৎসকেরা আইসিইউর প্রয়োজনের কথা বলেছিলেন। কিন্তু কোথাও সেই শয্যা মিলছিল না। শেষ পর্যন্ত শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। শনিবার দুপুরে সেখানেই মারা যায় শিশুটি।
হাসপাতালের বারান্দায় তখন সন্তানের নিথর দেহের পাশে বসে কাঁদছিলেন বাবা মোরশেদ আলম ও মা খোরশেদা বেগম। কিছুক্ষণ আগেও যে শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য তারা হাসপাতালের দরজায় দরজায় ছুটছিলেন, এখন সেই শিশুটিকে কোলে নিয়ে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি তাদের। শিশুটির বাড়ি সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায়।
শিশুটির বাবা মোরশেদ আলম জানান, শুক্রবার রাত সাড়ে সাতটার দিকে শিশুটিকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউ প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেখানে আইসিইউ না পাওয়ায় তারা ছুটে যান শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে।
মা-বাবার আশা ছিল, সেখানে হয়তো সন্তানের জন্য একটি আইসিইউ শয্যা পাওয়া যাবে। কিন্তু তাদের অভিযোগ, হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও সেই অপেক্ষা শেষ হয়নি।
মোরশেদ আলম ও খোরশেদা বেগমের দাবি, তাদের শিশুটির জন্য অক্সিজেন প্রয়োজনের কথা জানানো হলেও তাদেরই অক্সিজেনের ব্যবস্থা করে আনতে বলা হয়। এরপর শিশুটির আইসিইউ প্রয়োজন হলেও শয্যা পাওয়া যায়নি।
প্রায় দুইঘণ্টা অপেক্ষার পর আয়ানের মৃত্যু হয় বলে দাবি তাদের। এরপর শিশুটিকে আইসিইউতে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তখন সন্তানের মৃত্যুর কারণ খুঁজছিলেন অসহায় বাবা-মা। তাদের প্রশ্ন, ‘রোগী মারা যাওয়ার পরই কীভাবে আইসিইউতে শয্যা খালি হলো?’
শিশুটির মৃত্যুর পর হাসপাতালজুড়ে এক করুণ দৃশ্য তৈরি হয়। যে মা-বাবা কিছুক্ষণ আগেও সন্তানের চিকিৎসার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছিলেন, তারা তখন নিথর শিশুটিকে নিয়ে বসে আছেন।
আট মাস বয়সী সেই শিশুটি হয়তো বুঝতেই পারেনি, তার জন্য কতটা দৌড়ঝাঁপ করছেন বাবা-মা। আর মা-বাবাও ভাবেননি, রাতের সেই ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে তাদের হাসপাতাল থেকে ফিরতে হবে শেষবারের মতো।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, শিশুটির চিকিৎসার জন্য তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি।
তবে শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের অভিযোগের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মিজানুর রহমান বলেন, শিশুটি যখন হাসপাতালে আসে, তখন আইসিইউতে কোনো শয্যা খালি ছিল না। তাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। পরে আইসিইউতে শয্যা খালি হলে তাকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
ডা. মিজানুর রহমান বলেন, শিশুটি এর আগে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি ছিল বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন। সেখান থেকে লিখিত অনুমোদন ছাড়া তারা সরাসরি শামসুদ্দিন হাসপাতালে নিয়ে আসেন। আগে থেকে যোগাযোগ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে আইসিইউর প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, কোনো রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন হলে আগে যোগাযোগ করে রোগী স্থানান্তর করা হলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া যায়।