লিখেছেন: আতিকুর রহমান নগরী
১৮ জুলাই, ২০২৪। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তখন তুঙ্গে। আন্দোলনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ওইদিন পুলিশের ধাওয়ায় খালের পানিতে ডুবে মারা যান রুদ্র সেন। তিনিই। সিলেটের প্রথম শহীদ। রুদ্র সেনের মৃত্যুর সংবাদে পরদিন ১৯ জুলাই সিলেট সরগরম হয়ে উঠে। ক্ষোভেবিক্ষোভে ফুঁসে উঠেন ছাত্রজনতা। ওইদিন ছিল শুক্রবার ছিল। বন্দরবাজার, কোর্ট পয়েন্টসহ বিভিন্ন ছিল উত্তাল। গোটা সিলেট মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হন সাংবাদিক এটিএম তুরাব। পুলিশের বুলেট কেড়ে নেয় মেধাবী সাংবাদিকের তাজা প্রাণ। তুরাব সিলেটের ২য় শহীদ। ২০ জুলাই সহকর্মী সাংবাদিক এটিএম তুরাবের জানাযায় অংশগ্রহণ করি।
তখন দেশজুরে জরুরী অবস্থা (কারফিউ) জারি ছিল। ইন্টারনেট বন্ধ ছিল সারাদেশে। আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে পুলিশ, বিজিবি সেনাবাহিনীর টহল চলছে নগরজুড়ে। জন সাধারণের চলাচলে বাঁধা দিচ্ছে পুলিশ। ওইদিন সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়।
সিলেটের সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন বন্দরবাজার, চৌহাট্রা আর শাবিপ্রবি ঘীরে। আমি শিবগঞ্জ এর বাসিন্দা হওয়াতে শিবগঞ্জ টু টিলাগড় এলাকার সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হলো আমাকে। রাস্তাঘাট ফাঁকা। টহল পুলিশের ভ্যানের দায়িত্বে থাকা পুলিশ যেনো ফিল্মের হিরো। চোখে সানগ্লাস। আর পুলিশের গাড়িটি শিবগঞ্জ পয়েন্টের মাঝে রাখা হয়েছে। যানবাহন চলাচল আটকানো হচ্ছে।
আমি আমার পেশাগত আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে ভিডিও ধারণ করতে করতে এগুচ্ছিলাম। দুই কনস্টেবলকে আমার দিকে আসতে দেখে কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে দৌড় দিলাম, ঠিক তখনই ড্রেনের দুই স্লেবের ফাঁকা জায়গায় আমার ডান পায়ের গোড়ালি ঢুকে গিয়ে আঘাত পাই। এরপরও পুলিশ এসে আমাকে কোমরে আঘাত করে। একদিন পর ২২ জুলাই বিকেল পর্যন্ত যখন পা ব্যথা কমছে না। তখন ইবনে সিনা রিকাবীবাজারস্থ অর্থোপেডিক্স বিশেষজ্ঞকে দেখাই। এক্সরের মাধ্যমে জানা গেল পায়ের গোড়ালির ২টা হাড্ডি ফেটে গেছে। প্লাস্টার দিয়ে আর ওষুধ কিনে বাসায় আসলাম। ওইদিনের ঘটনা আমার নিজের সহকর্মীদেরও তাৎক্ষণিক জানানো সম্ভব হয়নি কারণ ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। কাউকে ফোনেও পাচ্ছিলাম না। ২৪ জুলাই, ২০২৪ মধ্যরাত থেকে ইন্টারনেট সেবা চালু হল।
ছাত্রজনতার আন্দোলন। গণঅভ্যুত্থান। কবে সিলেটে শুরু হয়েছে তা অনেকেরই অজানা। এই নিবন্ধে এটাই আলোচনা করবো।
২০১৮তে শুরু হওয়া আন্দোলন। ২০২৫ সালে এসে আকাশকুসুম কল্পনার মতোই লেগেছে অনেকের কাছে। ১০জনের ওই বৈঠক যে পরবর্তীতে ১০ হাজারে, ১০ লাখে রূপ নিবে ধারণাও করা যায়নি, যাওয়ার কথাই ছিল না তখন। কঠোর পরিশ্রম আর হাল না ছাড়লে যে অসাধ্যকেও সাধ্যের গন্ডিতে আনা সম্ভব। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে জুলাই বিপ্লব আর বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন না দেখলে বুঝা যেতনা।
এক তথ্যমতে, সিলেটে জুলাই আন্দোলনে ১৯জন নিহত হলেও অন্তবর্তীকালীন সরকার ১৪জনকে শহীদেও স্বীকৃতি দিয়েছেন। ২০০জন আহত হয়েছেন। এদিকে সিএনজি অটোরিকশা শাহজাহান গুম রয়েছেন বলে জানা গেছে। আরো অসংখ্য মানুষজন যে ভূমিকা রেখেছেন। তার হিসেব কষা দুস্কর। তবে সিলেটে এই আন্দোলন এর সূচণা ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এমসি কলেজের মাঠে ১০জনের বৈঠকের মাধ্যমে৷ হয়ত এই শুরুর কথাটা অনেকেরই অজানা। কেনইবা অজানা থাকবে না। তারও অনেক কারণ ছিল। শুরুতে লোকজন কম। আন্দোলনের লক্ষ্যউদ্দেশ্য নিয়ে অনেকের না বুঝার জটিলতা।
আঠারোর এপ্রিল-জুলাইয়ের দিকে এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ছিল। কর্মসূচিতে পুলিধের বাঁধা ছিল। ছাত্ররা ফুল হাতে পুলিশের সাথে কথা বলেছিল। আর চব্বিশে এসে ছাত্রদের আন্দোলনকে যৌক্তিক মনে করে জনতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষজনের পূর্ণ সমর্থন প্রদান করেন।
শাবি হয়ে উঠে কেন্দ্রবিন্দু। আমজনতাসহ বিভিন্ন পেশার মানুষজন আন্দোলনে যোগদান করতে দেখা যায়। আবারও শাবি থেকে বের হয়ে আসলো পুরো সিলেটজুড়ে আন্দোলন। তীব্র গতিতে এগুতে থাকে। ওই কোটা সংস্কার থেকে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন, জুলাই বিপ্লব, গণ অভ্যুত্থান। আর ছাত্ররা তখন বলেছিল ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম সরকার।’ জয় হল ছাত্রজনতার। কোটা সংস্কার সফল হল।
লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক শ্যামল সিলেট