আজ বৃহস্পতিবার, ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে মাদ্রাসা ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের ভূমিকা

সিলেটের বার্তা ডেস্ক
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৫, ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ণ
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে মাদ্রাসা ও প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের ভূমিকা

লিখেছেন: হাফিজ মাওলানা ছালিম আহমদ খাঁ-

বাংলাদেশের ইতিহাসে গণঅভ্যুত্থান নতুন কিছু নয়। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। প্রতিবারই দেশের তরুণ সমাজ, বিশেষত ছাত্রসমাজ, অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানও তার ব্যতিক্রম নয়। এ আন্দোলনে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নয়, বরং মাদ্রাসা ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও শক্তিশালী অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতিকে নতুনভাবে চমকে দিয়েছে।মা

 

বাংলাদেশের ছাত্রআন্দোলনের ইতিহাসে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নিয়ে নানা ধরনের পূর্বধারণা বিদ্যমান ছিল। অনেকেই মনে করতেন, তারা জাতীয় রাজনীতি বা গণআন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, বরং শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষার ভেতরেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে।

গণঅভ্যুত্থানের সূচনালগ্ন থেকেই আলিয়া ও কওমি এই দুই ধারার মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাই রাজপথে নেমেছে। তারা শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, বরং সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, যশোর ও বরিশালসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও দলে দলে অংশগ্রহণ করেছে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের এই অংশগ্রহণ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

তাদের অংশগ্রহণ ছিল শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সংগঠিত। হাতে হাত ধরে সারিবদ্ধভাবে হাঁটা, ইসলামী স্লোগানের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক স্লোগান তোলা, অহিংস উপায়ে প্রতিবাদ জানানো। এসবই প্রমাণ করে যে তারা আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং পরিপক্ব রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা নিয়েই আন্দোলনে শামিল হয়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বরাবরই আত্মসংযম, শৃঙ্খলা ও ত্যাগের মানসিকতার জন্য পরিচিত। গণঅভ্যুত্থানের সময়ও তারা সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখেছে। কেউ নিজের পকেট খরচ থেকে আন্দোলনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছে, কেউ মিছিলে খাবার ও পানীয় সরবরাহ করেছে, আবার কেউ আহত আন্দোলনকারীদের সেবায় এগিয়ে এসেছে। অন্যদিকে তারা ভাঙচুর বা বিশৃঙ্খলায় জড়ায়নি; বরং তাদের শৃঙ্খলাপূর্ণ উপস্থিতি আন্দোলনকে অনেকাংশে শান্তিপূর্ণ রেখেছে, যা জনসমর্থন অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাদের অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, নৈতিক শক্তির ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রেখেছে। তারা আন্দোলনকে ন্যায়-অন্যায়ের সংগ্রাম হিসেবে দেখেছে। তাদের বক্তৃতা ও শ্লোগানে কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি এনে আন্দোলনের দাবিকে নৈতিক ভিত্তি প্রদান করেছে। এর ফলে সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ মানুষ, আন্দোলনের প্রতি আস্থা অর্জন করেছে।

পুলিশি বাধা, লাঠিচার্জ কিংবা গ্যাস নিক্ষেপের মুখেও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছেড়ে যায়নি। তাদের অটল অবস্থান দেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ছাত্রসমাজের ত্যাগ ও সাহসিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এ দৃশ্য অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করেছে।

গ্রামের মসজিদ ও মাদ্রাসা বাংলাদেশের সমাজজীবনে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দেয়ায় গ্রামের সাধারণ মানুষও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করতে শুরু করে। কারণ, তারা মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তান হিসেবে দেখে এবং তাদের প্রতি আস্থা রাখে। এর ফলে শহরের গণআন্দোলনের ঢেউ গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে, যা অভ্যুত্থানের সাফল্যে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কিংবা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা অবদান রেখেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তারা আলোচনার বাইরে থেকে যায়। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই ঐতিহাসিক ধারাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে এবং প্রমাণ করেছে যে, জাতির সংকটে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা কখনো পিছিয়ে থাকে না।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের অবদান
অন্যদিকে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ২০২৪ সালের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। আগে তাদেরকে প্রায়শই ‘ক্যাম্পাস-কেন্দ্রিক’ বা ‘বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত’ বলে সমালোচনা করা হতো। কিন্তু এ আন্দোলন তাদের নতুনভাবে চিনিয়েছে।

তারা সরাসরি মিছিলে অংশগ্রহণ করেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের প্রচার করেছে, সৃজনশীল পোস্টার ও ভিজ্যুয়াল তৈরি করেছে, এমনকি আন্দোলনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছে। অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এই আন্দোলনে মাদ্রাসা, প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক বিভাজন ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিন্নতা ভুলে গিয়ে তারা একযোগে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে।

মাদ্রাসার শৃঙ্খলা ও ত্যাগের মনোভাব, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃজনশীলতা ও ডিজিটাল দক্ষতা, আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক সংগ্রামী নেতৃত্ব এই তিন শক্তির সম্মিলন আন্দোলনকে করেছে ঐতিহাসিক।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের তরুণসমাজ কেবল ভবিষ্যতের প্রতীক নয়, বর্তমানেরও চালিকাশক্তি। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা তাদের সামাজিক দায়িত্ববোধ ও সংগ্রামী মনোভাব দিয়ে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের আধুনিক চিন্তাশক্তি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে, আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব দিয়ে এক নতুন জাতীয় শক্তিতে রূপ নিয়েছে।

এই অভ্যুত্থান তাই কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের অধ্যায় নয়, বরং তরুণদের ঐক্য, জাতীয় দায়বদ্ধতা ও সামাজিক পুনর্জাগরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

লেখক: সংগঠক ও সমাজকর্মী

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০