সিলেট ৩১শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ১৭ই মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ই রজব, ১৪৪৪ হিজরি

ষাট দশক থেকে আলেম-হাফেজ উপহার দিচ্ছে জামিয়া আঙ্গুরা

আতিকুর রহমান নগরী, নির্বাহী সম্পাদক
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৯, ২০২৩, ০৫:১৬ অপরাহ্ণ
ষাট দশক থেকে আলেম-হাফেজ উপহার দিচ্ছে জামিয়া আঙ্গুরা

হযরত শাহজালাল-শাহপরাণসহ ৩৬০ আউলিয়ার পূণ্যভূমি সিলেট তথা দেশে ইসলামের খেদমত আঞ্জাম দেয়ার জন্য ষাট দশক থেকে আলেম-হাফেজ উপহার দিয়ে যাচ্ছে জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর।

সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার কুড়ারবাজার ইউনিয়ন এর অন্তর্ভুক্ত ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর। কুশিয়ারা নদীর তীরঘেষে সিলেট জেলার অন্যতম এই দ্বীনি বিদ্যাপিঠটির অবস্থান।

জামিয়া থেকে কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রী তাকমিল ফিল হাদিস (মাস্টার্স) সমাপনকারীরা বর্তমানে বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বে ইসলামের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রেখে চলেছেন।

মাদরাসার একাধিক সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই জামিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, শিক্ষক-ছাত্রদের দারুণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। যে সম্পর্কের টান দেখে সিলেট বিভাগসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞানার্জনের জন্য এসে থাকেন।

এই সম্পর্কের সূত্র আর ধারাবাহিকতায় আজ বৃহস্পতিবার (১৯ জানুয়ারি) জামিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘প্রিয় ক্যাম্পাস সম্মেলন’। জামিয়ায় পড়ুয়া শিক্ষার্থী, ফাজিল, হাফেজদের নিয়ে এক মিলনমেলা করার উদ্দেশ্যে অনলাইনভিত্তিক গ্রুপ ‘প্রিয় ক্যাম্পাস’ এই অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে।

জামিয়ার মহাপরিচালক আল্লামা শায়খ জিয়া উদ্দিন এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার আহবানও জানিয়েছেন।

সম্মেলনের শৃঙ্খলার স্বার্থে আয়োজক কমিটি গুগল ফরমের মাধমে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমের উদ্যোগ নিয়েছে।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে দেশবিদেশ থেকে এ পর্যন্ত সহস্রাধিক শিক্ষার্থী সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন।

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে নাসিহাহ পেশ করবেন জামিয়ার মহাপরিচালক আল্লামা শায়খ জিয়া উদ্দিন। মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মাওলানা শরিফ মুহাম্মদ।

ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, দ্বীন রক্ষায় মাদরাসা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। দারুল উলূম দেওবন্দ তেমনি এক মাদরাসা। দ্বীনের এক শক্ত দূর্গ। সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে আছে তার শাখা-প্রশাখা। জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর তার একটি। দারুল উলূম দেওবন্দের চিন্তা-চেতনা লালন করে দ্বীন প্রতিষ্ঠায় নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আরেক নাম হচ্ছে- জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর।
পূর্ণ নাম: জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর, বিয়ানীবাজার, সিলেট। অবস্থান: বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার কুড়ারবাজার ইউনিয়নের আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর গ্রামে- কুশিয়ারা নদীর দক্ষিণতীর ঘেঁষে জামিয়ার অবস্থান।
অবকাঠামো: জামিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ভবন পৃথক দুটি বিশাল এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। কুশিয়ারার দক্ষিণতীর ঘেষে প্রায় এক একর জমি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একাডেমিক ভবন। শিক্ষা বিভাগীয় সকল কার্যক্রম এখানেই পরিচালিত হয়। আধ-মাইল দক্ষিণে আড়াই একর জমি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত জামিয়ার বিশাল ছাত্রাবাস। আবাসিক ছাত্ররা এখানে অবস্থান করে। মাদরাসার জায়গাদাতা: পুরাতন ভবনের জায়গাদাতা হলেন আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর গ্রামের মরহুম হাজি আব্দুল ক্বাদীর কটু মিয়া।
নতুন ভবনের জায়গাদাতা হলেন- যথাক্রমে: আলহাজ্জ শফিক উদ্দিন, আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর। আলহাজ আব্দুল খালিক কুটু মিয়া সাহেবের পরিবারবর্গ, গোবিন্দশ্রী। আলহাজ্জ মুঈনুদ্দীন গং, আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর (উত্তর-পূর্বপার)। আলহাজ্জ অজিহ উদ্দিন গং, আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর।
বিভাগীয় প্রধানগণ: মুহতাতীম: মাওলানা শায়খ জিয়া উদ্দীন দা. বা. নাজিম: মাওলানা শায়খ জিয়া উদ্দীন দা.বা. শায়খুল হাদীস: মাওলানা মুফতি মুজিবুর রহমান দা.বা. প্রধান মুফতি ও ইফতা বিভাগীয় প্রধান: শায়খুল হাদীস মুফতি মুজিবুর রহমান দা.বা. নাজিমে দারুল ইকামা: মাওলানা আব্দুল হাফিজ শমশেরনগরী দা.বা.
প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত: যাত্রা শুরুর সময়কাল: ১৯৬১ সালের ১৫ই এপ্রিল মুতাবিক ১৩৮১ হিজরির ১৭ই সফর জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যেখান থেকে শুভযাত্রা: আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর জামে মসজিদ থেকে জামিয়ার সবকদান শুরু হয়। স্থায়ী ব্যবস্থাপনার আগ পর্যন্ত মসজিদেই ক্লাস চলে। যেসব এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত: জামিয়া আটটি গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। গ্রামগুলো হচ্ছে:- আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর, গোবিন্দশ্রী, আকাখাজানা, আঙ্গুরা, শালেশ্বর, লাউঝারী, উত্তর আকাখাজানা, ফুলমলিক-ঘাগুয়া।
প্রতিষ্ঠার মূলে যিনি: ঐতিহ্যবাহী এ মাদরাসার প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিয়ানীবাজার উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের বরেণ্য শিক্ষাবিদ মাওলানা শায়খ শিহাবুদ্দীন রাহ.। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জামিয়ার পথচলাা শুরু হয়।
আরো যারা ছিলেন: মাদনাসার গোড়াপত্তনে মাওলানা শিহাবুদ্দিন একা ছিলেন না, সাথে ছিলেন আরো কয়েকজন জানবাজ মর্দে মুজহিদ। তাঁরা হলেন- মাওলানা মুসদ্দর আলী রাহ.-আকাখাজানা, মাওলানা শায়খ আব্দুল হাই রাহ.-সুপাতলা, মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব রাহ- দেউলগ্রাম, মাওলানা মুকাদ্দাস আলী রাহ.- আকাখাজানা, মাওলানা খলিলুর রাহমান- পাতন, মাওলানা ক্বারী যহুরুল হক- আঙ্গারজুর, মাওলানা মুসলিম উদ্দিন রাহ. মাওলানা বশির উদ্দিন- আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর, মাওলানা নিমার আলী- শালেশ্বর, মাস্টার আরজুমন্দ আলী- আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর প্রমুখ।
নামকরণ: ঐতিহ্যবাহী এই মাদরাসার নামকরণ করেন খলিফায়ে মাদানী আল্লামা শায়খ তাজাম্মুল আলী শায়খে আঙ্গুরা। তিনি স্বপ্নযোগে মাদরাসার নাম জামিয়া মাদানিয়া রাখার আদেশ পান।
পাঠদানের সূচনা: ১৩৮১ হিজরির সফর মাস থেকে জামিয়ার শিক্ষা-কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতেই প্রথম শ্রেণী থেকে ফযিলত (¯œাতক) ক্লাস পর্যন্ত সবক চলতে থাকে। ১৪০৫ হিজরির শাওয়াল মাসে ইসলামী শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর তাকমীল ফিল-হাদীস (টাইটেল) এবং ১৪৪২ হিজরীর শাওয়াল মাসে ইফতা বিভাগ খোলা হয়।
একাডেমিক তথ্য: জামিয়ার শিক্ষাবিভাগকে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। (১) ইসলামী আইন গবেষণা বিভাগ (ইফতা) (২) কিতাব বিভাগ (৩) হিফয বিভাগ (৪) এ. সি.ই একাডেমী। ইফতা বিভাগ এক বছর মেয়াদী। বিজ্ঞ মুফতি সাহেবানের তত্তাবধানে দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য দারুল ইফতার আদলে পাঠদান করা হয়। কিতাব বিভাগের পাঁচটি মারহালা বা স্তর:- (১) ইবতিদাইয়াহ (প্রাথমিক), (২) মুতাওয়াসসিতা (মাধ্যমিক), (৩) সানাবিয়্যা (উচ্চ মাধ্যমিক, (৪) ফযিলত (স্নাতক ), (৫) তাকমীল (মাস্টার্স)। পাঁচ মারহালায় মোট ১২টি ক্লাস রয়েছে। এসব ক্লাসে তাফসীর, উলূমুল-কুরআন, হাদীস, উসূলুল-হাদীস, ফিক্বহ, উসূলুল-ফিক্বহ, আক্বাইদ, ফারাইজ, ইতিহাস, আরাবী সাহিত্য, বালাগাহ, আরাবী ব্যাকরন- নাহু- সারফ, যুক্তিবিদ্যা, বাংলা, ইংরেজী, ভূগল, গণিত- ইত্যাদি শাস্ত্র পড়ানো হয়। হিফয বিভাগে নিতান্ত স্বল্পসময়ে হুফফাজের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ হাফেয দ্বারা কুরআনে কারীমের হিফয করানো হয়। এ. সি.ই একাডেমী হচ্ছে শিশুশিক্ষা বিভাগ। এই বিভাগের তিনবছর মেয়াদী কোর্সে কোমলমতি শিশুদেরকে ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা দেয়া হয়, পাশাপাশি বাংলা, অংক, ইংরেজিসহ সাধারণ শিক্ষার প্রাথমিক স্তরও পড়ানো হয়।
আনুষাঙ্গিক তথ্য: অনুষদ: জামিয়ার বৈশিষ্টের অন্যতম দিক হচ্ছে একদল দক্ষ এবং বিচক্ষণ আসাতিজার উপস্থিতি। বর্তমানে জামিয়ার শিক্ষকসংখ্যা ৩৩ জন। কিতাব বিভাগে ২৪ জন, হিফজ বিভাগে ৫জন এবং কিন্টারগার্ডেন বিভাগে ৪জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। ছাত্রসংখ্যা: বর্তমানে তিনবিভাগে জামিয়ার ছাত্রসংখ্যা মোট ১১০০ জন। ইফতা বিভাগে ১০ জন, কিতাব বিভাগে ৮০০ জন, হিফজ বিভাগে ১৮০ জন এবং কিন্টারগার্ডেন বিভাগে ১১০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে। কর্মচারী: জামিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে আঞ্জাম দিতে ০৮ জন কর্মচারী সর্বদা কর্মরত আছেন ।
ফাযিলসংখ্যা: এ পর্যন্ত (১৪৪২ হিজরী) ১৫২৪ জন শিক্ষার্থী জামেয়া থেকে ইলমে ওহীর সর্বোচ্চ সনদ অর্জন করে আলিম হয়েছেন। আবনাসংখ্যা: শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দশহাজার শিক্ষার্থী এখানে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ে অধ্যয়ন করেছেন। আয়সূত্র: মেীসুমী চাঁদা, ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মুক্তহস্তের দান, যাকাত, সাদাক্বা, ফিতরা, নিয়মিত দাতাসদস্যদের চাঁদা, ছাত্রদের বিভিন্ন ফি, উৎপন্ন ফসল বিক্রি বাবত আয়- ইত্যাদী। ব্যয়খাত: জামিয়ার ব্যয়খ্যাত মোট পাঁচটি: (১) জেনারেল ফান্ড (২) এমদাদ ফান্ড (৩) বিল্ডিং ফান্ড (৪) মসজিদ ফান্ড (৫) কুতুবখানা ফান্ড। পাঁচ ফান্ডে বাষিক খরচ প্রায় দুই কোটি টাকা। পরিচালনা পরিষদ: মজলিসে শূরা, মজলিসে আমেলা, মজলিসে আম।
প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো: প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। (১) এহতেমাম বিভাগ (২) শিক্ষা বিভাগ(৩) বোর্ডিং বিভাগ (৪) কুতুবখানা বিভাগ
এহতেমাম বিভাগ: এটি জামিয়ার প্রধান প্রশাসনিক বিভাগ। এই বিভাগের প্রধান জামিয়ার মূল পরিচালক। জামিয়ার যাবতীয় কার্যক্রমের দেখভাল তিনি করে থাকেন। তাঁকে মুহতামিম, মুদীর, রঈসুল জামিয়া, পরিচালক, প্রিন্সিপাল ইত্যাদি নামে ডাকা হয়।
শিক্ষাবিভাগ: শিক্ষাসংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম এই বিভাগের অধীনে। ছাত্রভর্তী থেকে শুরু করে নেসাব প্রণয়ন, রুটিন তৈরি, ছাত্রহাজিরা, পরীক্ষার ইন্তেজাম, ফলাফল প্রকাশ- এসবই শিক্ষাবিভাগ থেকে করা হয়। বিভাগীয় প্রধানকে নাযিমে তালীমাত বা শিক্ষাসচিব বলা হয়।
বোর্ডিং বিভাগ: ১৪০৩ হিজরিতে এই বিভাগ খোলা হয়। দারুল ইক্বামা বা ছাত্রাবাসের তাবৎ জিম্মা এই বিভাগের হাতে। আবাসিক ব্যবস্থাপনা, মাতবাখ, ক্লাসটাইমের বাইরে ছাত্রদের তদারকি- এসবই এ বিভাগ করে থাক্।ে একজন বিভাগীয় প্রধান ও কয়েকজন সহযোগী থাকেন। বিভাগীয় প্রধানকে নাযিমে দারুল ইক্বামা বা বোর্ডিং সুপার বলা হয়। বর্তমানে ১৯ জন শিক্ষক এবং প্রায় ছয়শত ছাত্র বোর্ডিংয়ে অবস্থান করছেন।
কুতুবখানা বিভাগ: জামিয়ার রয়েছে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থশালা। এতে রয়েছে মূল্যবান হাজারো বিরল কিতাবের বিশাল মজুত। স্তরে স্তরে সাজানো হয়েছে তাফসীর, উলূমুল-কুরআন, হাদীস, উসূলুল-হাদীস, ফিক্বহ, উসূলুল-ফিক্বহ, আক্বাইদ, ফারাইজ, ইতিহাস, আরাবী সাহিত্য, বালাগাহ, আরাবী ব্যাকরণ- নাহু- সারফ, যুক্তিবিদ্যা, জীবনী, সীরাত, রিজাল, রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ ধর্মীয় এবং জাগতিক বিশটি শাস্ত্রের প্রায় ১৫হাজার মূল্যবান কিতাব। বৎসরের শুরুতে গরীব ছাত্রদেরকে কুতুবখানা থেকে কিতাব সরবরাহ করা হয়। এই বিভাগের দায়িত্বে থাকেন দুইজন উস্তায। বিভাগীয় প্রধানকে নাযিমে মাকতাবাহ বলা হয়।
অন্যান্য সহযোগী বিভাগসমূহ: নিয়মিত বিভাগসমূহের পাশপাশি রয়েছে কয়েকটি সহযোগী বিভাগ। জামিয়ার চিন্তা-চেতনার সফল বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত বিভাগসমূহকে সহযোগিতা করাই হচ্ছে এসব বিভাগের কাজ। নিম্মে এগুলোর ফিরিস্তি তুলে ধরা হলো।
ফতোয়া বিভাগ: যে কোনো ধর্মীয় সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান দিতে জামিয়ার রয়েছে একটি শক্তিশালী ফতোয়া বোর্ড। ১৪০৯ হিজরিতে এই বিভাগ চালু করা হয়। এ পর্যন্ত ফতোয়া বিভাগ থেকে কয়েক হাজার ফতোয়া প্রকাশিত হয়েছে। দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ জনসাধারণের কাছে জামিয়ার ফতোয়া বিভাগের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
প্রকাশনা বিভাগ: ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা মানুষের সামনে তুলে ধরতে জামিয়ার রয়েছে একটি শক্তিশালী প্রকাশনা বিভাগ। এখান থেকে নিয়মিত গুরূত্বপূর্ণ প্রকাশনা পাবলিশ্ড হয়। হকের দাওয়াত দেয়া হয়, বাতিলের মুখোশ উন্মোচন করা হয়। এই বিভাগ থেকে নিয়মিত বার্ষিক ম্যাগাজিন আল-হিলাল বের হয়। এ পর্যন্ত আল-হিলালের ৩১ টি নিয়মিত সংখ্যা বের হয়েছে। বার্ষিক ম্যাগাজিনের পাশাপাশি প্রকাশনা বিভাগের অধীনে রয়েছে দুটি ত্রৈমাসিক দেয়ালপত্রিকা। আল-ফারুক নামে একটি বাংলা, এবং আল-ফুরক্বান নামে একটি আরবি দেয়ালিকা প্রতি তিনমাস অন্তর অন্তর বের হয়।১৪০৯ হিজরী থেকে দেয়ালিকার যাত্রা শুরু হয়। এছাড়া প্রতি বছর বার্ষিক মাহফিলের সময় শিহাবী পয়গাম নামে একটি বাংলা এবং আশ-শিহাবুস সাক্বিব নামে একটি আরবি ক্রোড়পত্র বের হয়। তাছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় দিবস এবং জামিয়ার বিভিন্ন বড় বড় সম্মেলনে বিভিন্ন সাময়িকী এবং স্মারকগ্রন্থ বের হয়ে থাকে।
কম্পিউটার প্রশিক্ষণ বিভাগ: বর্তমানে পৃথিবীতে কম্পিউটারের শাসন চলছে। সমগ্র দুনিয়া এখন আশ্রয় নিয়েছে কম্পিউটারের ভেতর। জামিয়া যুগ-চাহিদার এ দিকটি গুরূত্বের সাথে বিবেচনা করেছে। ১৪২৮ হিজরী থেকে জামিয়ায়
কম্পিউটার প্রশিক্ষণের জন্য নিয়মিত একটি বিভাগ চালু করা হয়। দুজন দক্ষ প্রশিক্ষকের মাধ্যমে জামিয়ার শিক্ষার্থীরা কম্পিউটারের প্রায়োগিক শিক্ষা অর্জন করে থাকে।
তাদরীবুল আরাবী: মুসলমানদের জাতীয় ভাষা আরবী। কুরআনের ভাষাও আরবী। ইলমে ওহীর প্রধান ভাষা আরবী। জামিয়ার শিক্ষামাধ্যমও আরবী। আরবী ভাষা শিক্ষায় এখানে নিয়মিত বিভাগের পাশাপাশি প্রতিদিন আসরের পর দক্ষ প্রশিক্ষকের দ্বারা আরাবী ভাষার প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ হয়। এই বিভাগের মাধ্যমে ছাত্রদেরকে আরবী লেখার পাশাপাশি অনর্গল আরবী বলারও প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। প্রতি বছর ঈদুল-আযহার আগেরদিন তাদরীবের পক্ষ থেকে আরবী সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
সাহিত্য প্রশিক্ষণ বিভাগ: সাহিত্য জাতির দর্পন। সাহিত্যের মাধ্যমে ইসলামের ব্যাপক খেদমত হয়। নিজে যা জানো, অন্যকে জানাও- এটাই হচ্ছে ইসলামের শিক্ষা। জানানোর শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে সাহিত্য। জামেয়া সাহিত্য চর্চায় বরাবরই গুরূত্ব দিয়ে আসছে। ছাত্রদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে ‘চেতনা সাহিত্য পরিষদ’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠন এখানে কাজ করে যাচ্ছে। চেতনার মাধ্যমে জামেয়া থেকে শক্তিমান লেখক-সাহিত্যিক বের হচ্ছেন। এদের মাধ্যমে ইসলাম ও দেশের ব্যাপক খেদমত হচ্ছে।
আক্বীদা: বিশ্বাসের ক্ষেত্রে জামিয়া আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ এর অনুসারী। জামিয়া আল্লাহ তাআলার যাত এবং সিফাতের ক্বাদীম হওয়ার প্রবক্তা। আল্লাহর যাত এবং সিফাতে কাউকে শরীক করে না। আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান, তিনি দেহ থেকে পবিত্র- এই বিশ্বাস জামিয়ার। ইসলামকেই একমাত্র মনোনীত ধর্ম মনে করে। সমস্ত নবীগণকে নিস্পাপ এবং সকলের প্রতি ঈমান আনা আবশ্যকীয় মনে করে। হযরত মুহাম্মদ সা. কে শ্রেষ্ট নবী, শেষ নবী, এবং মাটির তৈরী আল্লাহর প্রিয় বান্দা এবং রাসুল মনে করে। সাহাবায়ে কেরামের আদালতে বিশ্বাসী। শায়খাইনের শ্রেষ্টত্ব, খাতানাইনের মুহাব্বাত, আশারায়ে মুবাশশারার ফযিলত এবং উম্মাহাতুল মুমিনীনের অনন্য মর্যাদায় বিশ্বাসী। তাক্বদীরের ভালো-মন্দ, আখেরাত, কিয়ামত, কবরের আযাব, শাফায়াত, হাওজ, সিরাত, মিযান, হিসাব, কিতাব, পুরস্কার, তিরস্কার, জান্নাত, জাহান্নাম, কিয়ামতের আলামত, দাজ্জাল, নুযূলে ঈসা, ইয়জুজ-মাজুজের আত্বপ্রকাশ, দাব্বাতুল আরযের বের হওয়া, মিরাজ, আরশ, কুরসী, লওহ, ক্বলম- এর সত্যতায় বিশ্বাস করে। কুরআন আল্লাহর কালাম, কুরআন সৃষ্ট নয় , কুরআন ক্বাদীম- এই বিশ্বাস জামিয়ার। আসমানী সকল কিতাবের ঈমান, ফিরিশতা, জিবরীল, মালাকুল মাউত, কিরামান কাতিবীন, এবং জ্বীন জাতির অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। খিলাফাহ আলা মিনহাজিন নাবুওয়াহ, এবং নেযামে শরয়ীর তানফীযে বিশ্বাসী জামিয়া। জিহাদ ফরজ, সন্ত্রাস নয়; সন্ত্রাস দমনের ব্যবস্থা- এই বিশ্বাস জমিয়ার। কুরআনের পাশাপাশি হাদীসকেও হুজ্জাহ মানে। ইজমা এবং কিয়াসকেও উসূলে শরা’ এর অন্তর্ভূক্ত মনে করে। তাক্বলীদে শাখসীর বৈধতা এবং সালাফের মর্যাদায় বিশ্বাস করে জামিয়া। তাসাউফ, তাবলীগ এবং ইসলামী সিয়াসাহ এর স্বীকৃতি দেয় জামিয়া।
চিন্তা-চেতনায় জামিয়া দারুল উলূম দেওবন্দের আদর্শে বিশ্বাসী। শুধু নিজের চিন্তা না করে উম্মাহর সার্বজনীন চিন্তার তাগিদ জামিয়া দেয়। শাহ ওয়ালিউল্লাহর বিপ্লবী চেতনা এবং মুজাদ্দিদে আলফে সানীর সমাজসংস্কারের প্রেরণা লালন করে জামিয়া। সবধরণের বিদআত এবং কুসংস্কারের বিরোদ্ধে জামিয়া খড়গ্রস্থ। পীরপূজা, কবরপূজাসহগ সকল শিরক বিদআতের শেকড় উপড়াতে জামিয়া বদ্ধপরিকর।
আত্বশুদ্ধির ক্ষেত্রে জামিয়া তাসাউফচর্চায় বিশ্বাসী। চিশতিয়া, সাবেরিয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া এবং নক্বশবন্দিয়া- এই চার তরীক্বায় সুলূকের মেহনত করে থাকে জামিয়া। জামিয়া সাধারণ মুসলমানদের জন্যে নির্দিষ্ট এক ইমামের অনুসরণ ওয়াজিব মনে করে। এক্ষেত্রে জামিয়া হানাফী মাযহাবের মুক্বাল্লিদ। তবে অন্যান্য সকল ইমামকে শ্রদ্ধা করে এবং মাযহাব বিরোধীদের কঠোর সমালোচনা করে।
নযরিয়্যাহ বা চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে জামিয়া দারুল উলূম দেওবন্দের হুবহু অনুসরণ করে। শুধুমাত্র দারস-তাদরীস বা পড়া-পড়ানোকে জামিয়া একমাত্র দায়িত্ব মনে করে না। পড়ালেখার পাশাপাশি, উম্মাহর চিন্তা, তাবলীগে ইসলাম ,জাতীয় মুক্তি, নেযামে ইসলাম প্রতিষ্ঠা, সকল অপশক্তির প্রতিরোধ এবং ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সকল প্রচেষ্টা জামিয়া করে থাকে। এক্ষেত্রে জামিয়া দারুল উলূম দেওবন্দের রাজনৈতিক প্লাটফরম জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রাজনীতিতে বিশ্বাসী।
জামিয়ার অবদান: (১) যোগ্য, মুহাক্কিক, মুদাক্কিক, যুগসচেতন অসংখ্য আলেম সৃষ্টি। (২) ছয়দশক ধরে ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুন প্রতিষ্ঠায় নিরলস প্রচেষ্টা। সমাজের সর্বস্থরে একদল দক্ষ সমাজসংস্কারকের অনুপ্রবেশ ঘটানো। (৩) শতশত শক্তিমান লেখক তৈরী। (৪) বলিষ্টকন্ঠের অনলবর্ষী বক্তা তৈরী। (৫) দারুল উলূম দেওবন্দের চিন্তা-চেতনার সফল চাষ। একদল জানবাজ কর্মীবাহিনী সৃষ্টি। (৬) একসাথে তালীম, তাযকিয়া, তাবলীগ এবং তানফীযে দ্বীনের প্রচেষ্টা। (৭) বরাবরই প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল বাতিলের সময়োপযোগী প্রতিরোধ।

সংবাদটি শেয়ার করুন