সিলেট ৩১শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ১৭ই মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ই রজব, ১৪৪৪ হিজরি

যে বার্তা দিয়ে গেল কাতার বিশ্বকাপ

আফতাব চৌধুরী, সাংবাদিক-কলামিস্ট
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২৭, ২০২২, ০২:২০ পূর্বাহ্ণ
যে বার্তা দিয়ে গেল কাতার বিশ্বকাপ

শেষ হল কাতার বিশ্বকাপ ২০২২। আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ান। ফ্রান্স রানার্সআপ। ৩-৩ গোলে সমতায় থাকা ফাইনালের নিষ্পত্তি হয়েছে টাইব্রেকারের মাধ্যমে। লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামের এমন রোমাঞ্চকর ফাইনাল খেলা আমার মত অনেকেই জীবনে তো দেখিননি, সম্ভবত এটি ছিল সর্বকালের সেরা ফাইনাল ম্যাচ।

প্রশ্ন উঠছে – বিশ্বকাপ আয়োজনে কি সার্থক হতে পারল কাতার? পশ্চিমা মিডিয়া নেতিবাচক খবর প্রকাশ করে কারণে-অকারণে অনেকেই কাতার বিশ্বকাপকে কালিমালিপ্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা সফল হয়নি। মুসলমান প্রধান যে-কোনো দেশের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়ার যে চিরাচরিত নঞর্থক চিন্তাধারা তুলে ধরার অপপ্রয়াস, কাতারের ক্ষেত্রে এবার তারা সেই চক্রান্তে সফল হয়ে উঠতে পারেনি যা উঠে এসেছে ফিফা প্রেসিডেন্ট হ্যাভেলাঞ্চ -এর সন্তোষজনক প্রতিবেদনের মাধ্যমে। স্বাগতিক দেশ কাতারের সফল বিশ্বকাপ আয়োজন এবং সমাপন পশ্চিমা মিডিয়ার সকল অভিযোগ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

মিথ্যা হয়ে গেছে ওয়াশিংটন পোস্টের অভিযোগও। পৃথিবীর সেরা প্রগতিশীল পত্রিকাটি লিখেছিল, ‘দুই বিষয় শুরু থেকেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। বলা হয়, খেলার মঞ্চ যত বড়ো, সেখানে রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রভাবও তত গভীর হয়। পশ্চিমাদের সমালোচনা, নানা বাধা-বিপত্তির পরও বেশ ভালোভাবে ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন করেছে কাতার। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঘোষিত মানবতা এবং মানবিক ঐক্যের সেই চিরন্তন বাণী যেন স্টেডিয়ামগুলো-সহ, সার্বিক আয়োজনে, সর্বত্র, সব জায়গাতেই যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি হয়েছে প্রশংসিত। তার পরও কাতার বিশ্বকাপকে ইভেন্ট বলে উল্লেখ করেছেন ইউরোপীয় ফুটবলের বৈষম্যবিরোধী সংস্থা ফেয়ার-এর নির্বাহী পরিচালক পিয়ারা পাওয়ার। কিন্তু তা-ও, সুশোভিত ফুটবলশৈলীতে শেষ পর্যন্ত মুছে গেছে সব। মেসির হাতে বিশ্বকাপ উঠেছে। শতাব্দীর অন্যতম সেরা ফুটবলার তিনি। বিশ্বকাপ ছাড়া তাঁকে মানায় না। শুধু আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিশ্বকাপ জেতা নয়, মরক্কোর মতো নতুন শক্তির উত্থান এবার দেখেছে ফুটবল বিশ্ব। কত তারকার জন্ম হয়েছে। কত তারকা শেষও হয়ে গেছে। তবে বিশ্বকাপ মঞ্চে প্রতিবাদ থামেনি।

এবারের বিশ্বকাপের শুরুতে যে প্রতিবাদটি আয়োজকদের বেশ বিব্রত করেছিল, সেটি হচ্ছে শ্রমশোষণ ও শ্রমিকের নিরাপত্তা।

বিশ্বের সর্বত্র সামাজিক মূল্যবোধ একই মানের হয় না। আরববিশ্বে বিশেষ করে মুসলিমবিশ্বে সমাকামিতাসহ পশ্চিমা উলঙ্গপনা মোটেই অনুমোদিত নয়। তিউনিসিয়ার ফাতহি জুইনি তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, “তোমরা যদি মুখে হাত রাখো, তাহলে আমরা আমাদের নাক চেপে ধরব, যাতে তোমাদের উৎকট বর্ণবাদের গন্ধ টের না-পাই।’

অবশেষে ২৯ দিনের লড়াই শেষে, প্রতিবাদ-সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে এসেছে কাতার বিশ্বকাপ। সার্থক আয়োজনের পর তারা এখন প্রশংসার দাবিদার। তাই, এই মুহূর্তে কাতারকে অভিবাদন জানানোর সময় এটা। একটা অধ্যায় শেষ হলে অন্য অধ্যায়ের শুরু হয়। তেমনি কাতার বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পথেই আগমনী বার্তা রেখে গেল ২০২৬ বিশ্বকাপ। ২৩তম সেই বিশ্বকাপের আসর বসবে যৌথভাবে আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোতে। এই প্রথম কানাডা আয়োজক হতে যাচ্ছে। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা বিশ্বকাপের আয়োজন করেছিল। সেটিও ছিল এক আয়োজন। বেবেতো-রোমারিওর ব্রাজিল সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়। আর মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়েছিল ১৯৮৬-তে। সেবার, ম্যারাডোনার অনিন্দ্য প্রতিভা সেই টুর্নামেন্টকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। কানাডা ২০২৬-এ প্রথম বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক হবে। ফিফা আগেই ঘোষণা করেছে, আগামী বিশ্বকাপে অন্য একটা মহাদেশে ফুটবলের উত্থান হবে। ফুটবলের প্রসার হলে সেটা সুখের কথা। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আরব, আফ্রিকা ফুটবল জ্বরে সদাই আক্রান্ত। মাঝখানে লাতিন আমেরিকা পিছিয়ে পড়েছিল। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতায় ফুটবলের রঙ্গভূমিতে আবার জোয়ার আসবে। তাই কাতারকে অভিনন্দন জানিয়ে পরবর্তী বিশ্বকাপকে স্বাগত জানাচ্ছে ফুটবল দুনিয়া।

তবে অন্য কারণে কাতারের ধন্যবাদ প্রাপ্য। ছোট্ট একটা দেশ যেভাবে বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞ সফল করে নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে এক কথায় তা অসাধারণ। আর “যতসব সমালোচনা হয়, তাতে কান না-দিলেও চলে। ভার্জিনিয়ার রিচমন্ড ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক দানা এল কুর্ন ঠিকই বলছেন কথাটি। বিশ্বকাপের কিছু প্রতিবাদ দ্বিমুখী নীতি অনুশীলনের দায়ে দোষী হতে পারে। তাঁর ভাষায়, “কাতার বিশ্বকাপ নিয়ে মাঝে মাঝে আমরা এমন সমালোচনা দেখতে পাচ্ছি, যা খুবই যৌক্তিক এবং সমালোচনার যোগ্য। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব প্রতিবাদ ভ-ামি ও দ্বিমুখী নীতির প্রতিফলন মাত্র। এসবের পেছনে যে বর্ণবাদ একটা বড়ো মাপের ভূমিকা পালন করছে, তা বুঝতে না পারাটা আমাদের জন্য ভুল হবে। পশ্চিমারা এটা সব সময় ভাবে যে, আরবদের জোব্বার নিচে সব সময় ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্র নাচে। অথচ দোহায় বিদেশিরা মিলেমিশেই উপভোগ করেছে আনন্দমুখর পরিবেশে। তাই কাতারকে ধন্যবাদ। একই সঙ্গে ২০১৬ বিশ্বকাপকে স্বাগত। সাংবাদিক- কলামিস্ট। ২৭.১২.২০২২

সংবাদটি শেয়ার করুন