রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ১২:০১ অপরাহ্ন

জননেতা লুৎফুর রহমান স্মরণে

এডভোকেট মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী: / ৩৯ বার পঠিত
আপডেট : রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১, ১২:০১ অপরাহ্ন

ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে স্মৃতিকথা লেখা খুবই কষ্টকর। অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং জেলা জজ আদালতে সরকারের সাবেক আইন কৌঁসুলি এড্ভোকেট আব্দুল মুকিত চৌধুরী। এ শোকের জের শেষ হতে না হতেই চলে গেলেন আরেক ঘনিষ্ঠজন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় সভাপতি এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফুর ভাই। বয়সে সবার চেয়ে কিছু বড় হওয়ায় আমরা সহপাঠিরা বড় ভাইছাব ডাকতাম

বিগত শতাব্দির ষাট দশকের প্রথম দিকে সিলেট এমসি কলেজে পড়ার সময় আমাদের পরিচয় হয়। পরিচয়ের প্রাথমিক স্থান ছিল সিলেট শহরের মীরাবাজারস্থ মডেল হাইস্কুলের শিক্ষক মেস। এখানে বসবাস করতেন আমাদেরই সহপাঠী এবং খন্ডকালীন শিক্ষক বিশ্বনাথের শাহ মোদ্দাবির আলী,বর্তমান বিলাত প্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রহিম, বালাগঞ্জের প্রয়াত আব্দুল মুকিত চৌধুরী, দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের কয়েকবারের নির্বাচিত চেয়াম্যান প্রয়াত ছইদুর রহমান প্রমুখ। আমাদের বাসা পাশে থাকায় এবং সহপাঠি হওয়ায় আমিও এ মেসে প্রায়ই এসে আড্ডা দিতাম।

”আড্ডা দিতে আসতেন আমার স্কুল জীবনের কনিষ্ঠপাঠী ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত এনামুল হক, স্কুলে সহপাঠি ও আওয়ামী লীগ নেতা দক্ষিণ সুরমার খোজারখলা গ্রামের প্রয়াত তরিক উল্লাহ, আসতেন নব্য কলেজ সহপাঠি লুৎফুর রহমান, মদনমোহন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ছাত্রলীগ নেতা এবং বর্তমান কানাডা প্রবাসী সদ্য প্রয়াত মুহিবুর রহমান এবং প্রখ্যাত ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আখতার আহমদ প্রমুখসহ আরো অনেকেই। এনামুল হকের পিতা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মরহুম আব্দুল জব্বার সাহেব মডেল হাইস্কুলের হেডমাষ্টার থাকায় এরা সবার মডেল স্কুল মেসে বসবাসের সুযোগ হয়েছিল। মডেল-স্কুল মেসেই প্রায়ই আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ ও আড্ডার মাধ্যমেই আমাদের ঘনিষ্ঠতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল।”

তখন ছিল সামরিক স্বৈরশাসক আয়ূব খানের জামানা। খাঁন সাহেব গঠিত শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে উচ্চশিক্ষায় ডিগ্রি নেয়ার সময় বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষা সঙ্কোচন করার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। কারণ ছিল বর্তমান নিম্ন উচ্চশিক্ষার হার আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা। ছাত্রদের এ ন্যায্য দাবীকে দেশের নিষিদ্ধ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সমর্থন দেওয়ায় ছাত্র আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে উঠায় বাহ্যিক আন্দোলনকে স্থিমিত করতে সীমিত আকারে ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি দেয়া হয়। একইসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আয়ুব খাঁন প্রচলিত মৌলিক গণতান্ত্রিক নিয়মের ন্যায় অপ্রত্যক্ষ নির্বাচনে তথা প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। সিলেটেও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ন্যায় এমসি কলেজেও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সিলেটে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ এমসি কলেজেও ছাত্র ইউনিয়ন নামক ছাত্র সংগঠন শক্তিশালী ছিল। এ সময়ই লুৎফুর রহমানসহ আমরা ছাত্র ইউনিয়নের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করতে ছাত্র আন্দোলনসহ এমসি কলেজের ছাত্র সংসদের নির্বাচনে অংশ নিতে কলেজের নিরপেক্ষ ছাত্রদের সাথে মিলিত হয়ে বাহিরের রাজনৈতিক দল-নিরপেক্ষ আইডিয়েল পার্টি নামক একটি ছাত্র সংগঠন গঠন করে ছাত্রশক্তি নামক ছাত্র সংগঠনের সাথে মিলিত হয়ে ছাত্র ইউনিয়নের বিরুদ্ধে কলেজ নির্বাচনে জয়লাভ করি। ছাত্রশক্তির নেতৃবৃন্দকে নিয়ে ছাত্র-সংসদ গঠিত হয়। আমি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হই।

ওই সময় সিলেটে ছাত্রলীগ বলতে কোন সংগঠনই ছিল না বললেই চলে। মেডিকেল ছাত্র প্রয়াত দেওয়ান নুরুল হোসেন চঞ্চল এবং মদনমোহন কলেজের ছাত্র এনাম আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে নামকাওয়াস্তে একটি কমিটি ছিল। ১৯৬৩ সনে পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্রলীগের সম্মেলন ডাকা হলে ছাত্রলীগ নেতা চঞ্চল ভাইয়ের ঐকান্তিক অনুরোধে আমরা আইডিয়েল পার্টির নেতাগণ সর্বজনাব লুৎফুর রহমান, শাহ্ মোদ্দাবির আলী, আমি মুজিবুর রহমান এবং এনামুল হক পুরান ঢাকার পাকিস্তান মাঠে অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগ সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যোগ দেই। তখন পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। ঐ সময় প্রধান অতিথি হিসাবে যোগ দেন প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্ভুদ্ধ হয়ে গণতন্ত্র পুনঃরুদ্ধারে ছাত্রসমাজকে সক্রিয় হতে আহবান জানান। আমরা ছাত্রলীগের জাতিয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছাত্রলীগে যোগদান করে সিলেটের ছাত্রসংগঠন আইডিয়েল পার্টিকে ছাত্রলীগে রূপান্তর করি। এতে লুৎফুর রহমানের ভূমিকা ছিল অন্যতম।

”এমসি কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে আমরা উচ্চশিক্ষার্থে ঢাকায় চলে যাই। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন ও সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে ১৯৬৮ সনে সিলেট জেলা জজ কোর্টে আইনজীবী হিসাবে যোগ দেই। লুৎফুর রহমান ঢাকার প্রখ্যাত পগোজ স্কুলে শিক্ষকতায় যোগ দিয়ে শিক্ষকতার সাথে সাথে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে ১৯৭৩ সনে সিলেট জজকোর্টে আইনজীবী হিসাবে যোগ দেন। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনঃর্জীবিত হলে ইতিমধ্যে আমরা একই সাথে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত বাঙালির মুক্তি সনদ ছয় দফা আন্দোলন, ষড়যন্ত্রমূলক আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবের মুক্তিসহ ১৯৬৯ ইংরেজির গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ মুজিবের মুক্তি আন্দোলনে একসাথে কাজ করি। ঐ সময় লুৎফুর রহমান ঢাকায় থাকলেও প্রায়ই সিলেট আসতেন। ১৯৭০ সনের জাতীয় নির্বাচনে লুৎফুর রহমান বালাগঞ্জ থেকে বিপুল ভোটে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হন। আমি দল ও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ওসমানী সাহেবের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকি।”

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে আমরা প্রায়ই এক সঙ্গে ক্যাপ্টন আজিজের সাথে সহযোগী হিসাবে বিভিন্ন খন্ডযুদ্ধের পর কৌশলগত কারণে ভারতের করিমগঞ্জে আশ্রয় নেই। ভারতে আশ্রয় নিয়ে প্রথমে আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীর নেতৃতে লুৎফুর রহমানসহ আমরা ভারতের করিমগঞ্জ-শিলচর ও হাইলাকান্দিসহ বিভিন্ন সিমান্ত অঞ্চলে ঘনঘন জনসংযোগ করে তথায় অবস্থানরত স্থানীয় মুসলমানদেরকে পাকি-সৈন্যদের নৃশংস অত্যাচার সম্বন্ধে অবহিত করে তাঁদের সমর্থন লাভের চেষ্টায় লুৎফুর রহমানসহ আমরা কাজ করি।

বাংলাদেশ প্রবাসী সরকার গঠন এবং প্রবাসে ভারতের শিলিগুড়ির পাশে ভারতীয় সেনানিবাসে বাংলাদেশের নির্বাচিত এম এন এ ও এমপিদের সমন্বয়ে প্রবাসী সরকার ও সংসদের অধিবেশনে প্রধান সেনাপতি ওসমানি সাহেব কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখা প্রণয়ন ও তা অনুমোদিত হলে লুৎফুর রহমান ও আমাকে চার নম্বর সামরিক সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করার দায়িত্ব দেয়া হয়। আমরা সীমান্ত ও শরনার্থি শিবির থেকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য বাঙালি যুবকদেরকে উৎসাহিত ও সংগ্রহ করে বিভিন্ন যুবকেন্দ্রের মাধ্যমে চার-নম্বর সেক্টর কমান্ডার প্রয়াত মেজর চিত্তরঞ্জন দত্তের মাধ্যমে শিলচরের কাছে লোহার-বন্দ ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করতাম। মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহের কাজ বন্ধ হলে এবং জকিগঞ্জ মুক্ত হলে আমরা মুক্ত জকিগঞ্জে চলে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী, স্থানীয় সংসদ আব্দুর রহিম এডভোকেট ও আবদুল লতিফের নেতৃত্বে জকিগঞ্জে জনপ্রশাসন চালু করতে সাহায্য করি।

পরবর্তীতে আমরা দলবল নিয়ে সিলেট এসে পাকি-সেনাদের আত্মসমর্পন প্রত্যক্ষ করি। ইতিমধ্যে এলাকার বেসামরিক প্রশাসনিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী সম্পাদক দেওয়ান ফরিদ গাজীর নেতৃত্বে বর্তমান জেলা এমপি অফিসের সামনে কাঠের নির্মিত দু’তলা পুরানো লোকাল বোর্ডের উপরের তলায় কাউন্সিলের অফিস স্থানান্তর হয় এবং চেয়ারম্যানের নির্দেশে লুৎফুর রহমানকে তাঁর নিজ এলাকা বালাগঞ্জে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়। আমাকে দেয়া হয় সিলেট শহরের দায়িত্ব। বালাগঞ্জ বড় হওয়ায় এবং বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা সত্ত্বেও লুৎফুর রহমান দিবারাত্রি পরিশ্রম করে বালাগঞ্জ এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সফল হন।

পরবর্তিতে লুৎফুর রহমান সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতি ছিলেন সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুর পর লুৎফুর রহমান সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বসহ একই সাথে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানেরও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সর্ব্বসম্মতিতে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ সিলেট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

মধ্যখানে কিছুদিন বিলাত প্রবাসী হওয়া ছাড়া লুৎফুর রহমান প্রায় সারা জীবনই আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাধ্যমে নিঃস্বার্থভাবে জনসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি হৃদরোগি ছিলেন এবং বাসায় তাঁর স্ত্রীও ইদানিং মারাত্মক রোগ থেকে সুস্থ হন। এত দায়িত্ব সত্ত্বে লুৎফুর রহমান তাঁর উপর অর্পিত জনসেবা সংক্রান্ত কোন দায়িত্বই পারতপক্ষে অবহেলা করতেন না। এত ব্যস্ততার মধ্যেও বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ নিতেন-প্রয়োজনে সাহায্য করতেন।

লুৎফুর রহমান ছিলেন একজন আজীবন জন-সেবক। তাঁর আত্মার মুক্তি কামনা করে শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রবীণ আইনজীবী

 

দৈনিক সিলেটের ডাকের সৌজন্যে

 


সাবস্ক্রাইব করুন বার্তা ইউটিউব চ্যানেল
আমরা নিজস্ব সংবাদ তৈরীর পাশাপাশি জাতীয়/আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোনো আপত্তি থাকলে কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা গেল।

এই ক্যাটাগরীর আরও সংবাদ

এক ক্লিকে বিভাগের খবর